বাংলা নাট্য সাহিত্যের ধারা প্রশ্ন উত্তর // Class 11 2nd Semester // Class 11 Bangla Sahityer Itihas Semester 2
বাংলা নাট্য সাহিত্যের ধারা
5 মার্ক প্রশ্ন উত্তর
(১) বাংলা নাট্য সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব আলোচনা করো । ৫
উত্তর – সাহিত্য সৃষ্টি: বাংলা নাটকের দুর্বল প্রবাহকে সার্থক গতিরূপ দিয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন নাট্যকার মধুসূদন দত্ত। মধুসূদনের নাটক ও প্রহসন তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত, যথা-‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) এবং প্রহসন: ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৬০), ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০)।
পৌরাণিক: ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯), ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০); ঐতিহাসিক: ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯) নাটকের কাহিনি মূলত মহাভারতের আদিপর্বের শর্মিষ্ঠা-দেবযানী-যযাতির উপাখ্যান। কাহিনি ও চরিত্র সৃজনের ক্ষেত্রে এ নাটকে ছায়াপাত ঘটেছে মুখ্যত কালিদাসের সংস্কৃত নাটক ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’-এর।
‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০) নাটকে পাশ্চাত্যের জুনো, প্যালাস, ভিনাস, প্যারিস ও হেলেন চরিত্র যথাক্রমে শচী, মূরজা, রতি, ইন্দ্রনীল ও পদ্মাবতী হিসেবে রূপায়িত হয়েছে। এ নাটকেই মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন কলির সংলাপে।
‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১) নাটকের ঘটনা বিধৃত হয়েছে টডের ‘Annals and Antiquities of Rajasthan’ গ্রন্থ থেকে। এ নাটকে ইতিহাস অংশ যৎসামান্যই। এতে বর্ণিত হয়েছে রানা ভীমসিংহের কন্যা কুমারী কৃষ্ণার আত্মহত্যার কাহিনি। বাংলা সাহিত্যের এটি একটি শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হিসেবে খ্যাত।
এর পরেই উল্লেখ্য, দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৬০) ও ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০), যা ‘পদ্মাবতী’ নাটকের সমসময়েই রচিত হয়েছিল। প্রথমটির বিষয় নব্যশিক্ষায় শিক্ষিত নবীন সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যঙ্গ আর দ্বিতীয়টির বিষয় এক ধর্মধ্বজী বৃদ্ধ জমিদারের কুকীর্তি ও লাম্পট্য।
মধুসূদন জীবনের শেষদিকে আরও দুটি নাটক লেখেন-‘মায়াকানন’ (১৮৭৪) আর ‘বিষ না ধনুর্গুণ’। কিন্তু এগুলি তেমন উল্লেখ্য নয়।
(২) বাংলা নাট্য সাহিত্যে দীনবন্ধু মিত্রের কৃতিত্ব আলোচনা করো । ৫
উত্তর – দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যজগতে আবির্ভূত হন এবং ভাষা বিভাগের কাজের সূত্রে মফস্সলের গ্রামবাংলা ও মানুষজনকে দেখার অভিজ্ঞতাকে নিপুণভাবে সাহিত্যে ব্যবহার করেন। ‘কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতম্’ এই ছদ্মনামে নাটকটি প্রকাশিত হওয়ামাত্র নাটকটি অভিনয়-সফল-জনপ্রিয়তা অর্জন করে ও তৎকালীন নীলকর সাহেবদের অমানুষিক অত্যাচার তথা নীলচাষবিরোধী আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দান করে বা আন্দোলনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় ‘নীলদর্পণ’ হল বাংলার ‘Uncle Tom’s Cabin’।
কিন্তু দীনবন্ধু মিত্রের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে মূলত প্রহসনে। সেগুলি হল- ‘নবীন তপস্বিনী’ (১৮৬৩), ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ (১৮৬৬), ‘সধবার একাদশী’ (১৮৬৬), ‘লীলাবতী’ (১৮৬৭), ‘জামাই বারিক’ (১৮৭২) এবং ‘কমলে কামিনী’ (১৮৭৩)। এগুলির মধ্যে ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘লীলাবতী’ ও ‘কমলে কামিনী’-তে বর্ণিত হয়েছে কিছু রোমান্টিক প্রেমকাহিনি। ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ কিংবা ‘জামাই বারিক’ রচনা দুটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য ও উপভোগ্য। প্রথমটিতে বর্ণিত হয়েছে এক বৃদ্ধের বিবাহ বিড়ম্বনা, যা হাস্যকর অসংগতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে ফুটে উঠেছে ধনী সমাজের ঘরজামাই প্রথার প্রতি তীব্র তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। দীনবন্ধুর ‘সধবার একাদশী’ প্রহসনটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তাঁর নাট্যপ্রতিভা সম্পর্কে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন, “দীনবন্ধু মাত্র তেতাল্লিশ বৎসর বাঁচিয়াছিলেন। তিনি আর একটু দীর্ঘজীবী হইলে বাংলা নাটক যে-কোনো দেশের প্রথম শ্রেণির নাট্যসাহিত্যের সমকক্ষ হইতে পারিত।“
(৩) বাংলা নাট্য সাহিত্যে গিরিশচন্দ্র ঘোষের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করো । ৫
উত্তর – ভূমিকা: গিরিশচন্দ্র ছিলেন একইসঙ্গে অভিনেতা, নাটককার, নাট্যপরিচালক এবং অভিনয় শিক্ষক। তিনি কলকাতায় সাধারণ রঙ্গমঞ্চ স্থাপন করেন, ফলে সাধারণের পক্ষে অভিনয় দেখা সম্ভবপর হয়ে ওঠে।
নাট্যসমূহ: তিনি প্রায় পঞ্চাশটি নাটক লিখেছেন। নাটক রচনাতেই গিরিশচন্দ্র সবচেয়ে সফল। তাঁর ‘জনা’ (১৮৯৪) ও ‘পান্ডবগৌরব’ (১৯০০) একসময় অতি জনপ্রিয় হয়েছিল। এইসব নাটকে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের আদলে একটি ছন্দ গড়ে তোলেন যা ‘গৈরিশ ছন্দ’ নামে খ্যাত। গিরিশচন্দ্র রামকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর নাটকে ভক্তি ও নীতি প্রাধান্য পেয়েছে। ‘চৈতন্যলীলা’ (১৮৮৪) আর ‘বিল্বমঙ্গল’ (১৮৮৯) তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ।
আবার বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বাংলায় যে-দেশপ্রেমের উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল নাটকও তার থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। গিরিশচন্দ্র এই কারণেই লিখেছিলেন ‘সৎনাম’ (১৯০৪), ‘সিরাজদ্দৌলা’ (১৯০৬), ‘মীরকাশিম’ (১৯০৬), ‘ছত্রপতি শিবাজি’ (১৯০৭), ‘অশোক’ (১৮৮৯) নাটকগুলি।
কলকাতার বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন নিয়ে গিরিশচন্দ্র লিখেছিলেন-‘প্রফুল্ল’ (১৮৮৯), ‘হারানিধি’ (১৮৯০), ‘বলিদান’ (১৯০৫), ‘শাস্তি কি শাস্তি’ (১৩১৫ বঙ্গাব্দ), ‘মায়াবসান’ (১৮৯৮) -এর মতো নাটক। এগুলির মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল পারিবারিক জীবনের নাটক ‘প্রফুল্ল’।
গিরিশচন্দ্রের ‘সপ্তমীতে বিসর্জন’, ‘বড়োদিনের বকশিস’, ‘সভ্যতার পান্ডা’, ‘য্যায়সা কি ত্যায়সা’, ‘বেল্লিকবাজার’ এইসব স্থূল হাস্যরসের নাটকগুলি এই উদ্দেশ্যেই লেখা হয়। নাটক হিসেবে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্তি না-হলেও অভিনয়ের দাবিতে লেখা গিরিশচন্দ্রের নাটকগুলি বাংলা নাট্যসাহিত্যের বিকাশের সহায়ক ছিল এ কথা মেনে নিতেই হয়।
(৪) বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে উৎপল দত্তের ভূমিকা সংক্ষেপে লেখো ।
উত্তর – নাট্যসম্ভার: বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী উৎপল দত্ত (১৯২৯-১৯৯৩) ছিলেন একাধারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাটককার, নাট্য পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। তাঁর প্রধান নাটকগুলির মধ্যে ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘কল্লোল’, ‘ব্যারিকেড’, ‘মানুষের অধিকার’, ‘টিনের তলোয়ার’, ‘ছায়ানট’, ‘ঘুম নেই’, ‘রাইফেল’, ‘ভুলি নাই প্রিয়া’, ‘মাও সে তুং’ প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‘ফেরারী ফৌজ’ (১৯৬১) ত্রিশের দশকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। জীবনের স্বাভাবিক চাওয়াপাওয়ার কথা এই নাটকে ফুটে উঠেছে। ‘কল্লোল’ (১৯৬৫) নাটকটি ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত। নাট্যকার উৎপল দত্ত নৌবিদ্রোহকে এখানে শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এই নাটকে সশস্ত্র বিপ্লবের পক্ষে নাট্যকার রায় দিয়েছেন।
‘মানুষের অধিকার’ (১৯৬৮) নাটকে সহিংস আন্দোলনের প্রতি আস্থা রেখে তিনি দেখিয়েছেন, মুক্তির জন্য হত্যার বদলে হত্যা, হিংসার বদলে হিংসা কোনো অন্যায় নয়। নাটকটি আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। ‘টিনের তলোয়ার’ (১৯৭১) নাটকটি উনিশ শতকের প্রমোদপ্রিয় ‘বাবু’-দের বিরুদ্ধে মঞ্চশিল্পীদের প্রতিবাদের কাহিনি। ‘ছায়ানট’ নাটকে নাট্যকার চিত্রনির্মাতাদের জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘তিতুমীর’ (১৯৭৮) নাটকটি ফকির বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। ‘ব্যারিকেড’ (১৯৭২) জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের মুহূর্তে সাম্যবাদীদের প্রতিবাদের প্রকাশ। উৎপল দত্তের অধিকাংশ নাটকই প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতে রচিত।
সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর নাটকগুলি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়াররূপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রেরণায় পাঠক ও দর্শক সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছে।
(৫) দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত বিভিন্ন ধারার নাটকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে, বাংলা নাট্যসাহিত্যে তাঁর ভূমিকা কী তা বুঝিয়ে দাও । ৫
উত্তর – দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩) একাধারে কবি ও নাটককার। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে শেকসপিয়র-এর আদর্শ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নাটকগুলিকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়-
হাস্যরসাত্মক প্রহসন: দ্বিজেন্দ্রলালের প্রহসনধর্মী নাটকের মধ্যে ‘কল্কি অবতার’ (১৮৯৫), ‘বিরহ’ (১৮৯৭), ‘এ্যহস্পর্শ’ (১৯০০), ‘পুনর্জন্ম’ (১৯১১) প্রভৃতি প্রধান। এই নাটকগুলিতে দ্বিজেন্দ্রলাল তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কারের বিরোধিতা করেছেন। নাটকের চরিত্রগুলি রঙ্গ-কৌতুকপূর্ণ এবং বেশ উপভোগ্য। চরিত্রগুলির মধ্যে নিছক হাসির ভাঁড়ামি নেই।
পৌরানিক নাটক: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পৌরাণিক নাটকের মধ্যে ‘পাষাণী’ (১৯০০), ‘সীতা’ (১৯০৮), ‘ভীষ্ম’ (১৯১৪) প্রভৃতি প্রধান।
ঐতিহাসিক নাটক: তাঁর ঐতিহাসিক নাটকের মধ্যে ‘মেবার পতন’ (১৯০৮), ‘নূরজাহান’ (১৯০৮), ‘সাজাহান’ (১৯০৯), ‘চন্দ্রগুপ্ত’ (১৯১১) প্রভৃতি প্রধান। এই নাটকগুলিতে তিনি ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। শুধু ইতিহাসের চরিত্রকে চিত্রিত করেননি, চরিত্রগুলির মধ্যে মানবচরিত্রের সাধারণ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকেও জায়গা দিয়েছেন।
সামাজিক নাটক: দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘পরপারে’ (১৯১২), ‘বঙ্গনারী’ (১৯১৬) প্রভৃতি নাটকগুলিতে সমকালীন সামাজিক জীবনের ছবি আছে।
নাট্যসাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভূমিকা: ইউরোপীয় নাটকের পথ অনুসরণ করে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যের প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। পুরাণের ভক্তিময়তা থেকে মুক্ত করে বাংলা নাটককে তিনি নতুন পথে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক নাটকে ইতিহাসের সত্যের পাশাপাশি নাট্যরস সৃষ্টি ও মঞ্চ সফলতার দিকটিকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল নাটক রচনা করতে গিয়ে কখনোই সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে ফেলেননি। গিরিশচন্দ্রের যুগে রঙ্গালয়ের নাটক অভিজাত সাহিত্য থেকে অনেক দূরে ছিল, দ্বিজেন্দ্রলাল সেই দূরত্ব ঘোচানোর প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন।
(৬) বাংলা নাট্যসাহিত্যে তুলসী লাহিড়ীর কৃতিত্ব আলোচনা করো। ৫
উত্তর – নাট্যকার হিসেবে কৃতিত্ব: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা ইত্যাদি নানা বেদনাতুর অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যের বাঁকবদলে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল। সেই বাঁকের অন্যতম নাট্য-কারিগর হলেন তুলসী লাহিড়ী।
নাট্যকার তুলসী লাহিড়ীর নাট্যসরণী: ‘দুঃখীর ইমান’ (১৯৪৭), ‘পথিক’ (১৯৪৯), ‘ছেঁড়া তার’ (১৯৫০), ‘বাংলার মাটি’ (১৯৫৩), ‘লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার’ (১৯৫৯), ‘ঝড়ের মিলন’ (১৯৬০) ইত্যাদি।
তুলসী লাহিড়ীর নাট্যবিশিষ্টতার নানা মাত্রা:
(ক) বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা আর মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে তাঁর নাটক দরিদ্র মানুষের জীবনাচরণের দলিল হয়ে উঠেছে। ‘দুঃখীর ইমান’ এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
(খ) তাঁর নাটকে মূল্যবোধহীনতা ও ধর্মবোধের সার্বিক অপচয়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে মানবিক দর্শক ও পাঠককুল আপ্লুত হয়ে পড়ে।
(গ) মুসলিম সমাজের তালাকের সমস্যা নিয়ে শ্রেণি প্রভেদের নগ্নতাকে হাতিয়ার করে নাটককার তুলসী লাহিড়ী যে ‘ছেঁড়া তার’ নাটকখানি লিখলেন, তা কতটা কালজয়ী, সুধীপ্রধানের মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায়:
(ঘ) “কৃষক জীবনের সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মুসলিম সমাজের তালাকের সমস্যা তিনি যেভাবে এই নাটকে উত্থাপন করেছেন, বাংলা সাহিত্যে তার কোনো তুলনা আছে বলে জানি না।”
(ঙ) গণনাট্যের ব্যঞ্জনা, রঙ্গমঞ্চের সাজানো অভিনবত্ব, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কথা কণ্ঠে আনা, ভাষা ও সংলাপের ক্ষেত্রে অত্যাশ্চর্য বাস্তবতার প্রদর্শন ইত্যাদি তাঁর নাট্যদেহের মাংস ও মজ্জায় মিশ্রিত হয়ে আছে, যা এক বিরলদৃষ্ট ব্যাপার ।
(৭) বাংলা নাট্যসাহিত্যে মন্মথ রায়ের কৃতিত্ব আলোচনা করো । ৫
উত্তর – ভূমিকা: বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষে পরাধীন ভারতের অস্থির উত্তাল সময়ে বসেও যে-নাট্যকার পৌরাণিক নাটক রচনার মধ্য দিয়ে সফল নাট্যকার হতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি হলেন মন্মথ রায়। বিশেষত কল্লোলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নাটকের বলয়ে আনলেন নবতর বিষয় ভাবনা ও আঙ্গিকের নতুনতর সুর। সর্বোপরি আধুনিক জীবনের তরঙ্গসংকুল মাঝদরিয়ায় তিনি প্রথম জীবনে যেমন পৌরাণিক নাটকের তরণি বেয়েছেন, তেমনি পরিণত বয়সে একাঙ্ক নাটকের মাধ্যমে পাঠক ও দর্শক হৃদয়ে চিরজীবী হয়ে আছেন।
মন্মথ রায়ের নাট্যসরণী:
পৌরাণিক নাটক: ‘চাঁদসদাগর’ (১৯২৭), ‘দেবাসুর’ (১৯২৮), ‘কারাগার’ (১৯৩০) ইত্যাদি।
ঐতিহাসিক নাটক: ‘অশোক’ (১৯৩৩), ‘মীরকাশিম’ (১৯৩৮), ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ (১৯৫৮) ইত্যাদি।
সামাজিক নাটক: ‘মমতাময়ী হাসপাতাল’ (১৯৫২), ‘জীবনটাই নাটক’ (১৯৫৩) ইত্যাদি।
একাঙ্ক নাটক: ‘রাজপুরী’ (১৯২৫), ‘বিদ্যুৎপর্ণা’ (১৯২৭), ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ (১৯৬৭) ইত্যাদি।
মন্মথ রায়ের নাট্যবৈশিষ্ট্যের নানা মাত্রা:
(ক) পৌরাণিক বিষয়ের ওপর দৃকপাত করে তিনি আধুনিক জীবন সমস্যার প্রতীকী প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছিলেন।
(খ) চরিত্র সৃজনের মাধ্যমে নাট্যদ্বন্দ্ব ও সমাজদ্বন্দ্ব তাঁর নাটকে যে প্রকৃষ্টরূপে প্রতীয়মান, তার প্রমাণ ‘চাঁদ সদাগর’, ‘ইন্দ্র, চন্দনা’, ‘কঙ্কা’ প্রমুখ চরিত্র।
(গ) তীব্র গতিময়তা তাঁর নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একাঙ্ক নাটক তাই তাঁর হাতে অনিন্দ্যসুন্দর হয়ে উঠেছে।
(ঘ) মন্মথ রায়ের বেশ কিছু নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো রূপক ও সংকেতধর্মিতা লক্ষ করা যায়।
(ঙ) বীররস-সঞ্চারী বাংলা নাটক তাঁর হাতেই প্রকৃত স্থান খুঁজে পায়।
(চ) আধুনিক জীবনবোধ প্রায় তাঁর সব নাটকেই প্রদর্শিত হয়েছে।
(৮) রবীন্দ্র-নাটকের শ্রেণিবিভাগ করো । রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্যগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও । ২+৩=৫
উত্তর – কাব্যনাট্যসমূহ: সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলিকে আমরা পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করতে পারি। ভাগগুলি এইরকম-
কাব্যনাট্য: ‘রুদ্রচণ্ড’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ (১৮৮১), ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ (১৮৮৪), ‘কালমৃগয়া’ (১৮৮৮) ও ‘মায়ার খেলা’ (১৮৮৮)।
প্রথানুগ বা প্রচলিত রীতিসম্মত নাটক: ‘রাজা ও রাণী’ (১৮৮৯), ‘বিসর্জন’ (১৮৯০), ‘প্রায়শ্চিত্ত’ (১৯০৯), ‘গৃহপ্রবেশ’ (১৯২৫), ‘তপতী’ (১৯২৯) প্রভৃতি।
কৌতুক নাট্য: ‘শেষরক্ষা’ (১৮২৮), ‘গোড়ায় গলদ’ (১৮৯২), ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ (১৮৯৭), ‘চিরকুমার সভা’ (১৯২৬) ইত্যাদি।
রূপক-সাংকেতিক নাটক: ‘রাজা’ (১৯১০), ‘অরূপরতন’ (১৯১০), ‘অচলায়তন’ (১৯১২), ‘মুক্তধারা’ (১৯২২), ‘রক্তকরবী’ (১৯১৬), ‘ডাকঘর’ (১৯১২), ‘কালের যাত্রা’ (১৯৩২) প্রভৃতি।
নৃত্যনাট্য: ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১৯০৬), ‘চণ্ডালিকা’ (১৯৩৮), ‘শ্যামা’ (১৯৩৯) প্রভৃতি।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যধর্মী নাটকের মধ্যে ‘রুদ্রচণ্ড’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, ‘কালমৃগয়া’, ‘মায়ার খেলা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্রনাথ বোলপুরে পিতৃদেবের সন্নিধানে থাকার সময় ‘পৃথ্বীরাজের পরাজয়’ নামে একটি কাব্য রচনা করেন। ‘রুদ্রচণ্ড’ নাটকটি তারই নাট্যরূপ বলে মনে হয়। এর ভাষা অপরিণত, সাহিত্যিক মূল্য বিশেষ নেই।
বাল্মীকি প্রতিভা নাটকের কাহিনি নেওয়া হয়েছে দস্যু রত্নাকর-এর কাহিনি থেকে। দেশি-বিদেশি সংগীতের সমন্বয় এই নাটকে আনা হয়েছে। ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ তত্ত্বপ্রধান নাটক, এর আখ্যান কবির নিজস্ব। গীতিমাধুর্য এই নাটকের প্রাণ।
কালমৃগয়ার কাহিনি দশরথ কর্তৃক অন্ধমুনির পুত্রহত্যার কাহিনি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘মায়ার খেলা’ নাটকের সূত্রে কাব্যের মেলা। হৃদয়াবেগই এর প্রধান উপকরণ। ‘গান্ধারীর আবেদন’-এ গান্ধারীর মহান চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’ নাটকে মালিনীর নবধর্মের উপলব্ধি তাকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরও পড়ুন –
তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্প প্রশ্ন উত্তর
ভাব সম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর
লালন শাহ ফকিরের গান প্রশ্ন উত্তর
বই কেনা প্রবন্ধের প্রশ্ন উত্তর
বাংলা গদ্য প্রবন্ধের ধারা প্রশ্ন উত্তর
বাংলা কাব্য কবিতার ধারা প্রশ্ন উত্তর
YouTube – Samim Sir