সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর (শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত) // Sirajuddaula Natok Question Answer class 10 WBBSE

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর (শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত) // Sirajuddaula Natok Question Answer class 10 WBBSE

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর

4 মার্ক প্রশ্ন উত্তর

১. “কিন্তু ভদ্রতার অযোগ্য তোমরা” – কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলা হয়েছে ? এ কথা বলার কারণ কী ? ১+৩ [ MP ’17 ]

উত্তরউদ্দিষ্ট ব্যক্তি: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদৌল্লা’ নাটকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ তার আশ্রিত ব্রিটিশ কর্মচারী ওয়াটসকে উদ্দেশ্য করে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছেন।

এ কথা বলার কারণ: ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ ফেব্রুয়ারি নবাব সিরাজ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে যে আলিনগরের সন্ধি হয়েছিল, সেই সন্ধির শর্তসমূহ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্রিটিশ লঙ্ঘন করেছে। কলকাতার দুর্গকে দুর্ভেদ্য করা থেকে শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দস্তকের যথেচ্ছ ব্যবহার নবাবের চোখ এড়িয়ে যায়নি। শুধু তাই নয়, সিরাজ ছিলেন জমিদারতন্ত্রের বিরোধী রাজতন্ত্রের সমর্থক। তাই ধনী জমিদারেরা সিরাজের বিরুদ্ধে ছিল। ব্রিটিশ গোপনে সেই জমিদারদের সঙ্গে এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মিরজাফর এর সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। সিরাজ গুপ্তচরের প্রেরিত সংবাদ মারফত ব্রিটিশের এই অভিসন্ধিমূলক আচরণ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ কর্মচারী ওয়াটসকে তিনি এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন।

২. “মুন্সিজি, এই পত্রের মর্ম সভাসদদের বুঝিয়ে দিন।”- কে, কাকে পত্র লিখেছিলেন ? এই পত্রে কী লেখা ছিল ? ১+৩ [ MP ’18 ]

উত্তর – পত্র প্রাপক ও প্রেরক: ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পূর্ব রেজিমেন্টের সর্বাধিনায়ক কর্নেল চার্লস ওয়াটসন সিরাজ আশ্রিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত ওয়াটসকে পত্র লিখেছিলেন।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের বিজয়তোরণ উড্ডীন হওয়ার পশ্চাতে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পূর্ব রেজিমেন্টের প্রধান হয়েছিলেন এবং ক্লাইভের অনুরোধে তিনি নৌবাহিনী নিয়ে কলকাতা অভিযান করেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে নবাবের আধিপত্য নস্যাৎ করে দেন।

পত্রের মর্ম: অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন ওয়াটসকে যে পত্র লিখেছিলেন তার মর্মকথা হল এই যে, কর্নেল ক্লাইভ তাকে যে সেনাবাহিনীর আয়োজন করতে বলেছিলেন, তা শিগগিরই কলকাতা পৌঁছোচ্ছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি কলকাতা বন্দরে আরও বেশি সংখ্যায় সৈন্য ও জাহাজ পাঠাবেন। বাংলায় তিনি এমন আগুন জ্বালাবেন যে, গঙ্গার সমস্ত জল দিয়েও তা নেভানো যাবে না। বাস্তবিক এই পত্রের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের . আগ্রাসন নীতি, সাম্রাজ্যবাদী অভিঘাত এবং কূটনৈতিক অভিসন্ধি প্রকাশিত হয়েছে।

Click Here – বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রবন্ধের প্রশ্ন উত্তর

৩. “এই মুহূর্তে তুমি আমার দরবার ত্যাগ করো।” কে, কাকে, কেন দরবার ত্যাগ করতে বলেন ? ১+১+২

উত্তর – বক্তা ও শ্রোতা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা “সিরাজদ্দৌলা” নাটকে উদ্ধৃত আদেশটি করেছেন স্বয়ং সিরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটসের প্রতি।

দরকার ত্যাগ করতে বলার কারণ: বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্‌দ্দৌলা আত্মগত বিচক্ষণতার সূত্রে বুঝতে পেরেছিলেন যে, শত্রুর সঙ্গে ঘর-করা প্রকৃতপক্ষে পতনের স্বীকৃতি দেওয়া। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তদানীন্তন কার্যকলাপ সিরাজকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, বাণিজ্যের সূত্র ধরে ব্রিটিশ রাজনৈতিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। বাংলার মসনদ তাদের আকাঙ্ক্ষিত। ওয়াটস সেই ব্রিটিশ তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই গুপ্তচর। সিরাজের আশ্রয়ে থেকে তার পতনকে ত্বরান্বিত করার জন্য সে তৎপর। যার জন্য, সে একদিকে যেমন ব্রিটিশের দৌত্য করছে, অপরদিকে সিরাজ বিরোধীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। সুতরাং, সিরাজের সংগত কারণেই মনে হয়েছে যে, তার সমস্ত সংস্রব শীঘ্র ত্যাগ করা উচিত-দেশের স্বার্থে, স্বাধীনতার স্বার্থে এবং আত্মস্বার্থে। এইজন্য দ্বিধাহীনভাবে বলিষ্ঠ ভাষায় তিনি ওয়াটসকে রাজসভা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর

৪. “তোমাদের কাছে আমি লজ্জিত।”- বক্তা কাদের কাছে লজ্জিত ? বক্তার এরূপ অনুতাপের কারণ কী ? ১+৩

[ অথবা ], “তোমাদের কাছে আমি লজ্জিত।”- কে, কাদের কাছে লজ্জিত ? এই লজ্জার কারণ কী ? ২+২

উত্তর – বক্তা ও উদ্দিষ্ট: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত তাঁর জাতীয় চেতনা উদ্দীপক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-তে সিরাজের মুখে এরূপ অনুতাপব্যঞ্জক উক্তিটি বসিয়েছেন।

ফরাসি দূত মঁসিয়ে লা-র কাছে সিরাজ লজ্জা প্রকাশ করেছেন।

অনুতাপের কারণ: শাসক হিসেবে সিরাজ সংগতভাবেই চেয়েছিলেন যে, ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যে-যুদ্ধ ফরাসি ও ইংরেজদের মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে, তার প্রভাব যেন বাংলায় না এসে পড়ে। এরজন্য তিনি উভয়পক্ষকেই বাংলার শান্ত মাটিকে যুদ্ধের আগুনে উত্তপ্ত না করে তোলার নির্দেশ জারি করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। ফরাসিরা ছিল সিরাজের অনুগত ও বাধ্য। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিরক্ষার অজুহাতে শক্তি সঞ্চয় শুরু করে দিয়েছিল। তারা ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর আক্রমণ করেছিলেন সিরাজের বিনা অনুমতিতেই। পক্ষান্তরে, ব্রিটিশের আচরণে ফরাসিদের প্রতি সিরাজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছিল। এইজন্য ফরাসি দূত মঁসিয়ে লা-এর কাছে সিরাজ লজ্জা প্রকাশ করেছেন। রাজাশ্রয়ে থাকার পরেও ব্রিটিশের দৌরাত্ম্যে রাজ-পরিপোষণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য সিরাজ ফরাসিদের কাছে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়েছিলেন এবং তাই অনুতাপ বর্ষণ করেছেন।

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর

৫. “আমার এই অক্ষমতার জন্যে তোমরা আমাকে ক্ষমা করো”কে, কেন এই মন্তব্য করেছেন ? যাঁকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল ? ১+১+২

উত্তর – বক্তা ও তার মন্তব্যের কারণ: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে উদ্ধৃত উক্তির বক্তা হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা।

উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া: নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা অস্বীকার করে ব্রিটিশ ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর দখল করেছিল। যেহেতু সিরাজ বাংলার নবাব, তাই তার আশ্রিত ফরাসিদের রক্ষা করার দায়িত্বও তাঁরই উপর বর্তায়। এইজন্য, ফরাসিরা সিরাজের কাছে এসেছিল ব্রিটিশের উদ্ধত আচরণের প্রতিকারের জন্য। তার অর্থ এই যে, ব্রিটিশকে প্রতি-আক্রমণ করে সিরাজ তাদের যেন উচিত শিক্ষা দেন। কিন্তু সিরাজ দেশের শান্তির স্বার্থেই ব্রিটিশের সঙ্গে পুনর্বার কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাননি। ফরাসিদের প্রতি অন্তরের সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অনটন এবং পারিষদবর্গের উপদেশ অনুযায়ী উভয়ের প্রতিই তিনি উদাসীন থেকেছেন। অর্থাৎ, তিনি চন্দননগর কুঠি ফরাসিদের প্রত্যার্পণ করতে পারেননি। তাই একথা বলেছেন। কিন্তু বুদ্ধিমান মঁসিয়ে লা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সিরাজ অশুভ শক্তির দ্বারা পরিবৃত। ব্রিটিশের অভিসন্ধি তার কাছে অপরিজ্ঞাত নয়। ফরাসিরা চলে গেলে ব্রিটিশরা যে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এটা তিনি অনুমান করতে পেরেছিলেন। তিনি তাই বিদায়-বিধুর লগ্নে সিরাজকে সতর্ক ও সচেতন করে তুলতে চেয়েছেন।

Click Here – জ্ঞানচক্ষু গল্প প্রশ্ন উত্তর

৬. “তোমার কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে।” কে, কাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ? বক্তা উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর মহানুভব কেন ? ১+১+২

উত্তর – বক্তা ও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-তে বাংলার স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজ ফরাসি দূত মঁসিয়ে লা-র বিদায়কালীন মুহূর্তে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

মহানুভবতার কারণ: ইংরেজ ও ফরাসি উভয়ই ছিলেন – সাম্রাজ্যবাদী জাত। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল বাংলায় বাণিজ্য করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ এর তুলনায় ফরাসিরা সিরাজের প্রতি ছিলেন অনেকটাই অনুগত এবং বন্ধুভাবাপন্ন। সিরাজের কোনো ক্ষতি তারা করতে চাননি। উপরন্তু সদুপদেশ দিয়েছেন। ব্রিটিশের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে ফরাসিরা ছিল সিরাজের সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষী-এ ধারণা ছিল সিরাজের অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য। শাসনতান্ত্রিক সতর্কতার নিরিখে সিরাজ ফরাসি দূত মঁসিয়ে লা-কে বিদায় দিতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে হার্দিক মহানুভবতা চিরকাল জাগরুক থাকবে। সিরাজ এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাদের এই বিচ্ছেদ সাময়িক; অর্থাৎ ফরাসি দূত হিসেবে প্রয়োজনে সিরাজ আবার মঁসিয়ে লা-কে নিজের রাজসভায় আহ্বান করতে পারেন।

৭. “I know we shall never meet.” – এখানে আমাদের বলতে কাদের কথা বলা হয়েছে ? তাদের আর সাক্ষাৎ না হওয়ার কারণ কী ? ১+৩

উত্তর – আমাদের : শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা জাতীয়তাবাদী আবেগঋদ্ধ ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে উদ্ধৃত আলোচ্য অংশে আমাদের বলতে ফরাসি দূত মঁসিয়ে লা ও বাংলার নবাব সিরাজ-উদদৌলার কথা বলা হয়েছে।

সাক্ষাত না হওয়ার কারণ: ইউরোপে ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ পর্যন্ত সাত বছর ধরে ফরাসি ও ইংরেজের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এর ফলশ্রুতি হিসেবে বাংলায় ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দু একটি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। নবাব সিরাজ উভয় পক্ষকেই শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে প্রতিরক্ষার আশ্বাস দেন। কিন্তু, নবাবের নির্দেশকে অবমাননা করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের কুঠি দখল করেন। সিরাজসুহৃদ ফরাসিরা এর প্রতিকার স্বরূপ সিরাজকে ব্রিটিশ আক্রমণের অনুরোধ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক শান্তি রক্ষার জন্য সিরাজ বিজাতীয় দ্বন্দুে লিপ্ত হতে চাননি। এর ফলে ফরাসিরা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিল যে, ব্রিটিশ তাদের বাংলা থেকে উৎখাত করবে। কারণ, ইউরোপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফরাসিরা বিফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল। তার প্রভাব অনিবার্যভাবে বাংলাদেশেও পড়েছিল এবং ব্রিটিশ ক্রমশ শক্তিধর হয়ে উঠছিল। কাজেই, মঁসিয়ে লা স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্রিটিশ যদি একবার তাদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে পারে, তাহলে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং নেই বললেই চলে। তাই সিরাজের সঙ্গে এই দেখাই শেষ দেখা।

৮. “সে অপরাধ কি বারবার আমি স্বীকার করিনি!”কে এ কথা বলেছেন ? তার অপরাধটা কী ? কাদের কাছে তিনি সেই অপরাধ স্বীকার করেছিলেন ? ১+১+২

উত্তর – বক্তা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের স্বদেশি আবেগকম্পিত নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-তে স্বীকারোক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব স্বয়ং সিরাজ।

অপরাধ: নাট্যাংশে সিরাজের অপরাধগুলি হল –

প্রথমত, ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে পুর্ণিয়ার যুদ্ধে সিরাজের দ্বারা শওকত জংকে হত্যা, দ্বিতীয়ত, মাসি ঘসেটি বেগমকে বন্দি ও তার প্রাসাদ ধ্বংসীভূতকরণ, তৃতীয়ত, রায়দুর্লভ জগৎশেঠ, উমিচাঁদ প্রমুখ মনসবদারদের অবমাননা, চতুর্থত, সিরাজের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব ও লাম্পট্য।

অপরাধ স্বীকার: কিন্তু বাস্তবিক, উপরোক্ত বিতর্কিত অপরাদের ঊর্ধ্বে এ কথা স্বীকার্য যে, সিরাজ ছিলেন সরলমতি, নিরহংকার ও দেশহিতৈষী। যার জন্য তিনি তার সভাসদবৃন্দের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন-এখানেই তার মহানুভবতার পরিচয়।

Click Here – অসুখী একজন কবিতার প্রশ্ন উত্তর

. “আর কত হেয় আমাকে করতে চান আপনারা?”  কারা, কাকে, কীভাবে হেয় করেছিল ? ১+১+২

[ অথবা ], “আর কত হেয় আমাকে করতে চান আপনারা?”বক্তা কে ? তাঁকে কারা, কীভাবে হেয় করেছিল ? ১+১+২

উত্তর – বক্তা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে বিতর্কের ঝড়ে বিক্ষুব্ধ, বীতশ্রদ্ধ নবাব সিরাজ হলেন উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা।

যারা, যেভাবে হেয় করেছিল: সিংহাসনে আরোহণ করার পর থেকেই সিরাজ-বিরোধী ষড়যন্ত্রীরা সমালোচনার তীক্ষ্ণ শরনিক্ষেপে সিরাজকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তারা সারা দেশে সিরাজের নামে দুর্নাম রটিয়েছেন, সিরাজের নামে লাম্পট্যের অভিযোগ এনেছেন, কর্মচারীদের মনে অশ্রদ্ধা এনে দিয়েছেন, আত্মীয়স্বজনদের মন দিয়েছেন বিষিয়ে। শুধু তাই নয়; সিরাজ ‘অর্বাচীন যুবক”, “অহংকার ও অজ্ঞতায় উন্মত্ত”, “ক্ষমতা – ও আধিপত্যের নেশায় আত্মহারা”, এমনকি তিনি নাকি হিন্দুদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ-এইসব রটনা সিরাজের হৃদয় বিদীর্ণ করে তুলেছিল। রাজাসনে নব্য-অভিষিক্ত যুবক সিরাজ বিরোধিতার ঝটিকাবর্তে বিমূঢ়বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আলোচ্য উক্তিতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজের আন্তরিক ক্ষোভ মর্মস্পর্শীভাবে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছে।

. “দরবার ত্যাগ করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি জাঁহাপনা।”- বক্তা কে ? তাঁরা কেন দরবার ত্যাগ করতে চান ? ১+৩ [MP ‘20]

উত্তর – বক্তা: ঐতিহাসিক রসঘন নাটক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’-র পাঠ্যাংশে নির্বাচিত দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে নবাবের সিপাহশালার মিরজাফর উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন।

দরবার ত্যাগের কারণ: আলোচ্য নাট্যাংশে মিরজাফর একটি খল চরিত্র। তিনি নবাবের প্রধান সিপাহসালার। কিন্তু বাংলা সনদে বসার জন্য ব্রিটিশের দেখানো স্বপ্নে তিনি বিভোর ছিলেন। সেইভ ন্য ব্রিটিশ ও সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে তিনিও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এক্ষণে নবাব মিরমদন ও মোহনলালকে উচ্চপদে অভিষিক্ত করলে তিনি হিংসায় ফেটে পড়েছেন। উপরন্তু মিরমদন ও মোহনলাল যখন তার ক্রিয়াকর্মের সমালোচনা করেছেন, তখন তার বিরুদ্ধে আত্ম-অহংকার জাহির করা ছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো হাতিয়ার তার কাছে ছিল না। তিনি নবাবের নব্য সেনাপতিদ্বয়কে ‘অর্বাচীন’ বলে তিরস্কারও করেছেন। এ ছাড়াও রাজা রাজবল্লভ, দুর্লভরায়, উমিচাঁদ প্রমুখকে নিয়ে নবাবের অনুমতি ছাড়াই দরবার ত্যাগ করতে চেয়েছেন। এতে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে নবাবের অনুমতির অপেক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে মিরজাফর এই কথাগুলি বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের প্রকৃত স্বরূপ নবাবের কাছে উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। সুতরাং নবাবের আশ্রয়ে থেকে ভবিষ্যতে নবাবের বিরোধিতা করা আর যাবে না। প্রকৃতপক্ষে তারা যেন নিজের কপটতার কাছেই হার স্বীকার করেছিলেন। এই জন্যই তারা দরবার ত্যাগ করতে চেয়েছেন।

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর

. “আজ বিচারের দিন নয়, সৌহার্দ্য স্থাপনের দিন!” বক্তা কে ? কাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেছেন ? উদ্ধৃত উক্তির আলোকে বক্তার কী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে লেখো ১+১+২

উত্তর – বক্তা: বিখ্যাত নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা বাংলার স্বাধীনতা সূর্যের শেষ সাক্ষী স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দৌলা।

যাদের উদ্দেশে বলা: তিনি রাজ সমালোচনায় বিক্ষুব্ধ ও মুখর সভাসদবৃন্দের কাছে উপরোক্ত আবেদনটি করেছেন।

বক্তার মনোভাব: পরাধীন ভারতবর্ষে স্বাধীনচেতা দেশহিতৈষী এক আদর্শ রাজার সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন সিরাজ চরিত্রের মধ্য দিয়ে যিনি আত্মশ্লাঘার ঊর্ধ্বে উঠে শত্রুকেও মিত্র রূপে বুকে টেনে নিতে পেরেছিলেন। তাই তার সৃষ্ট সিরাজ সব রকম জটিলতা ও ভিন্নতার মধ্যে প্রীতির পথ, মৈত্রীর পথ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। সিরাজ বুঝেছিলেন যে, বাংলাদেশের দুই মুখ্য শক্তি হিন্দু ও মুসলমান জাতিকে পৃথক করে হীনবল করাই ব্রিটিশ এর উদ্দেশ্য ছিল। এই সময় নিজেদের দোষত্রুটির চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে উত্তপ্ত বাতাবরণ সৃষ্টি করা বৃথা। পারস্পরিক সৌহার্দ্য বোধ এবং একতাকে অস্ত্র করে নিয়েই প্রবল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে-এই ছিল সিরাজের উপলব্ধি। সিরাজ বলতে চেয়েছেন, অপরাধের বোঝা কারওরই কম নয়; স্বয়ং ঈশ্বর রয়েছেন তার পরম বিচারক। বলাই বাহুল্য, সিরাজের সৎ ভাবাবেগ উচ্ছ্বসিত স্বদেশ ভাবনার উচ্চকিত প্রকাশে তার পারিষদবর্গ এবং বাংলার জনগণ যেন স্বস্তির বাতাস পেয়েছিল।

১২. “বাংলার এই দুর্দিনে আমাকে ত্যাগ করবেন না।” -কাদের উদ্দেশে এ কথা বলা হয়েছে ? কোন্ দুর্দিনের জন্য তাঁর এই আবেদন ? ১+৩ [MP ’19]

উত্তর – যাদের উদ্দেশে বলা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের স্বদেশি আবেগ তাড়িত নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-তে উদ্ধৃত উক্তির বক্তা হলেন স্বাধীন বাংলার অন্তিম উজ্জ্বল প্রদীপ সিরাজ-উদ্দৌলা। তিনি তার সভাসদদের এবং সিপাহসালার মিরজাফরকে উদ্দেশ করে উদ্ধৃত কথাগুলি বলেছিলেন।

দুর্দিনটি হল: নবাব আলীবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর থেকেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলায়মান হয়ে পড়েছিল। সিরাজ মসনদে বসার পর বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অন্ধকারে মগ্ন হয়ে পড়ল। একদিকে আত্মীয়স্বজনদের বিরোধিতা ও ঈর্ষার আগুন তার হৃদয়কে ভস্মসাৎ করেছে, অপরদিকে, ব্রিটিশের চক্রান্তে তার পারিষদবর্গ ও সিপাহসালার সকলেই তার বিরুদ্ধশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যথেচ্ছাচারের ওপর সিরাজের নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সিরাজের পতনের জন্য তারা তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। একদিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ব্যাপৃত করা, অন্যদিকে মিরজাফরকে মসনদের লোভ দেখিয়ে নির্লিপ্ত থাকার আদেশ দিয়ে সিরাজকে শক্তিহীন করে তোলা এবং যে মনসবদাররা সিরাজের পক্ষে ছিলেন, তাদেরকে সিরাজের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলা এসমস্তই ছিল তাদের কলঙ্কিত কীর্তি। কাজেই, সিরাজের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানোর অর্থ ব্রিটিশের অভিসন্ধি পূরণ করা। এই উপলব্ধি থেকেই দেশপ্রেমিক সিরাজ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে দেশপ্রেমের আবেগে প্রাণিত করে তোলার জন্য বাংলার এই দুর্দিনের রেখাচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তারই সভায় উপস্থিত মান্যবর্গের কাছে।

. “বাংলার মান, বাংলার মর্যাদা, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়াসে আপনারা আপনাদের শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, সর্ব রকমে আমাকে সাহায্য করুন।” সিরাজ কাদের কাছে এই আবেদন জানিয়েছেন ? কেন তিনি এই সাহায্যের প্রত্যাশী হয়েছেন ? ১+৩

উত্তর – উদ্দিষ্ট: জাতীয় বিপ্লবের মহালগ্নে রচিত শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে উদ্ধৃত আবেদনটি করেছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ তার সভাসদবৃন্দ ও সিপাহসালার মিরজাফরের কাছে।

সাহায্যের প্রত্যাশী হওয়ার কারণ : নাট্যকার ব্রিটিশলাঞ্ছিত অসহায় পরাধীন জাতির মুক্তিদূত হিসেবে নবাব সিরাজ-উদ্‌দ্দৌলাকে উপস্থাপিত করেছিলেন তাঁর নাটকে। তাঁর সিরাজ ইতিহাসের জীর্ণ পাতার কালিমালিপ্ত সিরাজ নন, তিনি একাধারে প্রজাবৎসল, পৌরুষ ও বীর্যের শীর্ষে অধিষ্ঠিত, বলিষ্ঠ অথচ ক্ষমাশীল একজন স্বাধীনচেতা নবাব। তিনি যেমন একদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম, অপরদিকে নিজের দোষ স্বীকার করতেও দ্বিধাগ্রস্থ নন। দেশহিতৈষিতার আবেগপ্রাণিত * সিরাজ নিজের চরিত্রের গুণে শত্রুকেও বন্ধু করে নেন। সেইজন্য, ব্রিটিশের আগমনে বাংলার মান-মর্যাদা ও স্বাধীনতার যে সংকট উপস্থিত হয়েছিল, তিনি জাতিধর্মনির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। বাস্তবিক, তিনি একতার মূল্য বুঝতেন এবং সেই জন্যই পারস্পরিক দোষারোপের ক্ষুব্ধ বাতাবরণ ছেড়ে জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন সভাসদদের।

১৪. “বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়- মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।” – কাদের উদ্দেশ করে এ কথা বলা হয়েছে ? এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বক্তার কী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে ? ১+৩ [MP ’18]

উত্তর – উদ্দিষ্ট: বাংলার স্বাধীনতা সূর্যের অস্ত-অন্তিম লগ্নে দাঁড়িয়ে নবাব সিরাজ-উদ্‌দ্দৌলা তাঁর সভাসদদের অর্থাৎ রাজা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ এবং জাফর আলি খাঁ-কে উদ্দেশ করে এই কথাগুলি বলেছিলেন।

বক্তার চরিত্রবৈশিষ্ট্য: নাট্যকার যে সময়ে এই নাটকটি লিখেছিলেন তখন একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবলতর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মুসলিম লিগের প্রচার ও প্রসারের ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনও স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। নাট্যকার উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিদেশির শৃঙ্খলমোচনে সাম্প্রদায়িক প্রীতির একান্ত আবশ্যক। সেইজন্য, নবাব সিরাজের রাজধানী মুরশিদাবাদ শুধু মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ক্ষুদ্র ভূভাগ নয়, তা সমগ্র বাংলাদেশের রূপ। জাতপাতের পক্ষপাতহীন নবাব স্বীকার করেছেন যে, তিনি যে অপরাধ করেছেন তা মিলিত হিন্দু-মুসলমানের কাছেই করেছেন, আর আঘাতও সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকেই পেয়েছেন। উভয় গোষ্ঠীরই মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এইভাবে তিনি এক ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তা গঠনের প্রয়াসী হয়েছিলেন।

. “জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী;” বক্তা কে ? তার এরূপ মনে হওয়ার কারণ কী ? ১+৩

[ অথবা ], “জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী;”- কোন জাতির কথা বলা হয়েছে ? তার সৌভাগ্য সূর্য অস্তাচলগামী বলার কারণ কী ? ১+৩

উত্তর – বক্তা: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা।

উক্ত জাতি: নবাব সিরাজ এখানে হিন্দু-মুসলমানের অখণ্ড বাঙালি জাতিকে চিহ্নিত করেছেন।

উক্ত মন্তব্যের কারণ: বাঙালি জাতি ঐতিহ্যের গর্বে বলীয়ান ও মহীয়ান। শিল্প-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাহিত্যে ও ব্যক্তিত্বে বাঙালির অতীত ও ঐতিহ্য সূর্যের দীপ্তিতে ভাস্বর। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নীতির প্রয়োগের সবই ধ্বংসোন্মুখ করে তুলেছে। এমনকি জাতির ঐক্য শক্তিকেও দ্বিধাবিভক্ত করতে চেয়েছে। অবশেষে বাংলার স্বাধীনতা বিনষ্ট করতে চেয়েছে আর বঙ্গমাতার রক্ষক সিরাজকে অপসারণ করা সাম্প্রতিক লক্ষ্য। সিরাজ কল্পনা করেছেন, নিশীথ অন্ধকারে সুপ্ত সন্তানকে কোলে নিয়ে ক্রন্দনরতা বঙ্গজননী ভোরের জন্য অপেক্ষমান। তিনি নৈরাশ্য দগ্ধ ও ভরসাহীন। নাট্যকার অপূর্ব চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে সমকাল ও সিরাজের হৃদয়ের রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন।

সিরাজদ্দৌলা নাটকের প্রশ্ন উত্তর

. “আমি আজ ধন্য! আমি ধন্য!”বক্তা কে ? উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গ নির্দেশ করো ১+৩

[ অথবা ], “আমি আজ ধন্য! আমি ধন্য!”– কার উক্তি ? তার এই উক্তির কারণ কী ? ১+৩

উত্তর বক্তা: দেশপ্রেমের আবেগতাড়িত নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশে উদ্ধৃত অংশের বক্তা হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা।

প্রসঙ্গ: বলাই বাহুল্য, নাট্যকার এই নাটকে ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে নিজ কল্পনার সুষ্ঠু সমীকরণ ঘটিয়েছেন। এখানে বঙ্গমাতার দুর্দশা বর্ণনা করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বাতাবরণ সৃষ্টি করে নবাব সিরাজ যে উদ্দীপ্ত ভাষণ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার সভাসদদের প্রতি, তারই ফলস্বরূপ মিরজাফর, সিরাজ-বিরোধী ষড়যন্ত্রীদের মধ্যে যিনি অন্যতম প্রধান, তিনি স্বয়ং সিরাজকে আশ্বাস দিয়েছেন সর্ব রকমের সহযোগিতার। শুধু তাই নয়, সিরাজের বিশ্বস্ত অনুচর মোহনলাল ও মিরমদন সিরাজের আদেশপালন করার জন্য মৃত্যুকেও দোসর করে নিতে পিছপা হননি। নবাব সিরাজ তাদের এই আশ্বাস বাণীতে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন, গর্বিত হয়েছেন, হৃত শক্তি ফিরে পেয়েছেন। তাঁর এই আনন্দঘন মুহূর্তের উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ উদ্ধৃত উক্তির মধ্যে ধরা পড়েছে।

১৭. “ওখানে কী দেখচ মূর্খ, বিবেকের দিকে চেয়ে দ্যাখো।” -বক্তা কে? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি বক্তার কী মনোভাব লক্ষ করা যায় ? ১+৩ [MP’19]

উত্তর বক্তা: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ইতিহাসরস সমৃদ্ধ নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-তে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন সিরাজের মাসি মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম।

বক্তার মনোভাব : ঘসেটি বেগমের মনোগত ইচ্ছা ছিল তার দ্বিতীয় বোন মুনিরা বেগম এর-ছেলে শওকত জং-কে বাংলার মসনদে বসানোর। কিন্তু সিরাজের সুনিপুণ যুদ্ধ কৌশলের কাছে শওকত জং পূর্ণিয়ার যুদ্ধে মারা যান। ঘসেটি বেগম রাজা রাজবল্লভের সঙ্গে এক হয়ে সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রে একজন প্রধান স্থপতি হয়ে ওঠেন। এইজন্য সিরাজ তাকে নজরবন্দি করেন। এখানে সেই জন্যই ঘসেটি বেগম সিরাজের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিলেন এবং প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছিলেন।

সিরাজ যখন গোলামহোসেনকে সিংহাসনের অস্তিত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন ঘসেটি অন্তরাল থেকে তা শুনে সিরাজকে ‘মূর্খ’ বলে তিরস্কার করে বিবেকের দিকে চেয়ে দেখতে বলেন। অর্থাৎ সিরাজ সিংহাসন আরোহণের জন্য শওকত জংকে হত্যা করেছেন, হোসেনকুলি-কেও হত্যা করেছেন, নিজের মাতৃসমা মাসিকে বন্দি করেছেন। এই সমুদয় অপরাধের গ্লানি বিবেক দংশনের রূপ ধরে তাকে উন্মত্ত করে তুলেছিল যার প্রতিচ্ছায়া তিনি নিজের সিংহাসনে দেখতে পেয়েছেন। ঘসেটি বোঝাতে চেয়েছেন যে, গুরুজনের প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তার অভিশাপে জর্জরিত হয়ে পতন ত্বরান্বিত হবেই।

১৮. “ওর নিশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গ-সঞ্চালনে ভূমিকম্প!” – ‘ওর’বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে ? বক্তার উদ্দিষ্টের প্রতি এমন মন্তব্যের কারণ আলোচনা করো । ১+৩

উত্তর – ‘ওর’ অর্থাৎ উদ্দিষ্ট: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক রসঘন ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে উদ্ধৃত অংশের ‘ওর’ বলতে সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগমকে বোঝানো হয়েছে।

মন্তব্যের কারণ: ঘসেটি বেগম ছিলেন নবাব বিরোধী ষড়যন্ত্রের অপরাধে সিরাজের রাজবন্দিনী। বন্দিনী হলেও সিরাজ তাকে মায়ের মতো সম্মান দিয়ে মায়ের বোনকে মায়ের পাশে বসিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আত্ম স্বার্থসিদ্ধি না-হওয়ার জন্য ঘসেটি সিরাজদম্পতিকে তিরস্কৃত বাক্যানলে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করছিলেন, অমঙ্গল কামনা এবং অভিশাপে জর্জরিত করে তুলেছিলেন। এখানে লুৎফান্নেসার কথায় স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাজ অন্তপুরে ঘসেটি বেগমের সাহচর্যে নবাব মহিষীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। দানবী পিশাচিনীরূপী এই প্রবীণা লুৎফার কোমল হৃদয়ে বিষের যন্ত্রণা অনুপ্রবিষ্ট করে দিয়েছিল। তাই, অত্যন্ত অসহায়া এক নারীর মতো আর্তক্রন্দনে লুৎফান্নেসা স্বামীর কাছে অনুনয় করেছেন, ঘসেটি বেগমকে তার প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। এর থেকে ঘসেটির হিংসাপ্রবণ, কোপনস্বভাব, পৈশাচিক রূপটি ফুটে উঠেছে।

Click Here – বাংলা ব্যাকরণ: সমাস

. “এইবার হয় ত শেষ যুদ্ধ!”– কোন যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে ? বক্তা এই যুদ্ধকে ‘শেষ যুদ্ধ’ বলেছেন কেন ?  ১+৩ [MP’20]

উত্তর – যুদ্ধটি হল: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ট্র্যাজিক রসঘন ঐতিহাসিক ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ ব্রিটিশের সঙ্গে পলাশির প্রান্তরে আসন্ন ইতিহাসখ্যাত ‘পলাশির যুদ্ধ’-কেই নির্দেশ করেছেন।

শেষ যুদ্ধ বলার কারণ: মাত্র পনেরো মাসের নবাবিত্বে দূরদর্শী সিরাজ বিষম অভিজ্ঞতায় প্রবীণ হয়ে উঠেছিলেন। গুপ্তচর মারফত তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন যে, রবার্ট ক্লাইভ সসৈন্যে পলাশির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন। তাঁর রাজসভায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থাও তাঁর অনুকূল নয়। অর্থাৎ, তাঁর দেশপ্রেমের আবেগতাড়িত ভাষণে সিপাহসালার মিরজাফর এবং জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, রাজা রাজবল্লভ প্রমুখরা তাঁকে সর্বরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তাদের বিশ্বাসঘাতকতার চরিত্র বদলাতে সক্ষম নন। মোহনলাল ও মিরমদনের সহায়তায় কতিপয় সৈন্য নিয়ে প্রবল ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অস্তিত্বরক্ষা নিয়ে তিনি ছিলেন আশঙ্কিত, উদ্বিগ্ন ও সন্দিগ্ধচিত্ত। তিনি জানতেন, আগামী এই যুদ্ধে তাঁর জয়লাভ ব্রিটিশের পুনর্বার যুদ্ধ ঘোষণার সাহস হরণ করবে। আবার, এই যুদ্ধে সম্ভাবনাপ্রবল পরাভবের অর্থ মৃত্যু। অর্থাৎ পলাশি যেন তার জীবনযুদ্ধের প্রতীক। একজন ট্র্যাজিক নায়কের এই ভবিষ্যদর্শন পক্ষান্তরে তাঁর আত্মদর্শন, আপন মৃত্যুদর্শন।

২০. ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশ অবলম্বনে সিরাজ চরিত্রের উপর আলোকপাত করো

[ অথবা], ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশ অবলম্বনে সিরাজদ্দৌলার চরিত্রবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। ১+৩ [ MP’17 ]

উত্তর ভূমিকা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের স্বাদেশিক চেতনাঋদ্ধ ‘সিরাজদৌল্লা’ নাট্যাংশে নাট্যকার যে সিরাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন তা ইতিহাসের সিরাজের থেকে ভিন্নতর। সিরাজ চরিত্রে সমন্বিত হয়েছে একাধিক গুণাবলি।

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:

প্রথমত, নাট্যকার সিরাজ-উদ্দৌলাকে স্বদেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বঙ্গমাতার দুর্দশার কথা সিরাজ প্রকাশ করেছেন এইভাবে-“বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, তার শ্যামল প্রান্তরে আজ রক্তের আলপনা, জাতির সৌভাগ্য-সূর্য আজ অস্তাচলগামী।” তিনি তার আবেগদীপ্ত ভাষণে শত্রুপক্ষকেও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূত ওয়াটসকে বিতাড়িত করার সময় তিনি বলেছেন, “…..কিন্তু আমি যে সকলের শয়তানের সন্ধান রাখি, তার সামান্য পরিচয় আজ দিয়ে রাখলাম।”-এর থেকে তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতা প্রমাণিত।

তৃতীয়ত, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্ত্রীর প্রতি অনাবিল প্রেম সিরাজ চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ষড়যন্ত্রী ঘসেটি বেগমকে তিনি মায়ের আসনে বসিয়েছিলেন। আর লুৎফান্নেসার কাছে অকপটে খুলে দিয়েছেন তাঁর রক্তাক্ত হৃদয়।

চতুর্থত, আত্মপক্ষপাতহীন অপরাধবোধ সিরাজকে মহনীয় করে তুলেছে। নিজের দোষ স্বীকার করতে তিনি দ্বিধাগ্রস্থ নন। নিজেই বলেছেন, “অপরাধ আমি যা করিচি, তা মিলিত হিন্দু-মুসলমানের কাছেই করিচি….”

পঞ্চমত, সিরাজের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় ঐক্যের একটি অনবদ্য দৃষ্টান্ত।

ষষ্ঠত, গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো সিরাজ যেন নিয়তিতাড়িত ভাগ্য লাঞ্ছিত একজন অসহায় স্বাধীনচেতা নবাব যার করুণ পরিণতি আমাদের মনে ‘pity and fear’-এর উদ্রেক করে।

সপ্তমত, সিরাজ ক্ষমতালিপ্পু নন। পলাশির যুদ্ধের অবসানে তিনি নিজের বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন তাঁর সভাসদদের ওপর। বলেছেন, “সেদিন যে দন্ড আপনারা দেবেন, আমি মাথা পেতে নেব।……….আমি হৃষ্টমনে সিংহাসন ছেড়ে দেব।”-এইভাবে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব পিতৃসম আদর্শ রাজার বিগ্রহ হয়ে উঠেছেন।

Click Here – আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি প্রশ্ন উত্তর

. ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশ অবলম্বনে সিরাজের দেশপ্রেমের পরিচয় দাও

উত্তর – ভূমিকা: শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের স্বাদেশিক চেতনার আবেগঋদ্ধ নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-য় সিরাজ চরিত্রসৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে নাট্যকার দেশপ্রেমের জয়গান গেয়েছেন। এই নাটকে সিরাজ ইতিহাসকথিত স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরাচারী কিংবা উন্মাদনাগ্রস্থ শাসক নন। তিনি প্রজাবৎসল, দেশহিতৈষী, এবং আমৃত্যু মুক্তিসংগ্রামী রূপেই প্রতিভাত হয়েছেন।

দেশপ্রেমের পরিচয়: সিরাজের দেশপ্রেম ছিল তাঁর জীবনের সত্যানুভুতি, দুর্বার জীবনবোধ, অখণ্ড সম্প্রদায়প্রীতি ও প্রজাহিতৈষণার পরিশীলিত রূপ। আসলে নাট্যকার যে সময় এই নাটক রচনা করেছেন, তখন সমগ্র দেশে দেশাত্মবোধ ও স্বাধীনতা আন্দোলন প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। একদিকে মুসলিম লীগের প্রচার ও প্রসারের ফলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন স্পষ্টতর হয়ে ওঠেছে। আবার অপরদিকে, জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী বিভেদও মেরুকৃত হয়েছে। এই সময় প্রয়োজন ছিল একান্ত সম্প্রীতির বন্ধন। শচীন্দ্রনাথ সিরাজ তাই আশাদীপ্ত আবেগে বলেছেন, “বাংলার মান, বাংলার মর্যাদা, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়াসে আপনারা আপনাদের শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, সর্ব রকমে আমাকে সাহায্য করুন।” বাঙালির সার্বিক মঙ্গল কামনাই নাট্যকারের অন্বিষ্ট। সিরাজই তাঁর প্রকাশ মাধ্যম যিনি দ্ব্যর্থহীন বলিষ্ঠতায় ভাষণ দেন, “বাংলা শুধু মুসলমানের নয়-মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।” সংকীর্ণ দলাদলি, পারস্পরিক দোষারোপ, আত্ম স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে গিয়ে সিরাজ একজন দেশপ্রেমিক, বঙ্গমাতার প্রতি অতল গভীর প্রেম নিয়ে তিনি জীবনাবসানের ঝুঁকি নিতে পারেন।

২২. ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাট্যাংশ অবলম্বনে ঘসেটি বেগম চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর – ভূমিকা: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক রসসমৃদ্ধ নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’-য় ইতিহাসকে বিকৃত না-করে এখানে ঘসেটি বেগমের চিত্র অঙ্কিত করেছেন।

প্রাথমিক পরিচয়: নবাব আলীবর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম সিরাজের মাসি। তাঁর কোপনস্বভাব, প্রতিহিংসাপরায়ণ বাক্যশর বর্ষণের একটা পটভূমি আছে।

চরিত্রবৈশিষ্ট্য:

প্রথমত, তার স্বামী নওয়াজিশ মোহাম্মদ খাঁ ছিলেন ঢাকার শাসনকর্তা। নবাব আলীবর্দির মৃত্যুর পর তিনিই ছিলেন বাংলার মসনদের দাবিদার। কিন্তু আলিবর্দির জীবদ্দশাতেই তার মৃত্যু ঘটে। এ থেকে বোঝা যায়, তার স্ত্রী ঘসেটি অপরিমেয় এক শূন্যতায় বিদীর্ণ হচ্ছিলেন।

দ্বিতীয়ত, ঘসেটি আলিবর্দির অপর দৌহিত্র শওকত জংকে বাংলার মসনদে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পূর্ণিয়ার যুদ্ধে সিরাজ তাকে পরাজিত ও হত করায় তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়নি।

তৃতীয়ত, সিরাজ-বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে তার যোগসাজশের খবর প্রকাশ পাওয়ায় তিনি তার মোতিঝিল প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হন এবং সিরাজের প্রাসাদের অন্তঃপুরে নজরবন্দি হন। এই ঘটনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত। তার নিজের কথাতেই তা প্রকাশিত-“মাসিকে তুমি গৃহ-হারা করেচ, মাসির সর্বস্ব লুটে নিয়েচ, মাসিকের দাসী করে রেখেচ। মাসী তা ভুলবে?”

চতুর্থত, তিনি ভেবেছিলেন যে, সিরাজের পতনেই তাঁর মুক্তি অপেক্ষা করছে। তাই অন্তঃকরণ থেকে তিনি সিরাজের ধ্বংস কামনা করতেন।

পঞ্চমত, প্রতিহিংসাপরায়ণা, ক্ষমতার লোভে অন্ধ ঘসেটি স্পষ্টতই সিরাজকে জানিয়ে দিয়েছেন, “আমার রাজ্য নাই, তাই আমার কাছে রাজনীতিও নাই-আছে শুধু প্রতিহিংসা।“

ষষ্ঠত, ঘসেটি ছিলেন অত্যন্ত কুচক্রী, অমানবিক ও পিশাচিনীতুল্য। তাঁর হিংসার আগুন, শুধু সিরাজকে নয়, সিরাজ মহিষী লুৎফান্নেসাকেও নিদারুণভাবে দগ্ধ করেছে। লুৎফার বক্তব্যেই তা পরিষ্কার- “ওর সঙ্গে থাকতে আমার ভয় হয়। মনে হয়, ওর নিশ্বাসে বিষ, ওর দৃষ্টিতে আগুন, ওর অঙ্গ-সঞ্চালনে ভূমিকম্প।“

সপ্তমত, ঘসেটি চরিত্রটি নিষ্ঠুরতার মোড়কে ঢাকা থাকলেও তাঁর মধ্যে ছিল অন্তরের এক গোপন ব্যর্থতাজনিত শূন্যতাবোধ। দুঃখসাথী, অত্যাচারের প্রতিকারে অক্ষম এই অনাথা বিধবা সিরাজকে করুণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন-“আর আমার বুক যে জ্বলে-পুড়ে-খাক হয়ে যাচ্ছে, তা কি তোমরা বুঝেছ, না কখনও বুঝতে চেয়েছ?”

উপসংহার: সবশেষে বলা যায়, ঘসেটি চরিত্রটি যদিও দর্শকের মনে ঘৃণা ও অশ্রদ্ধার, বিতৃয়া ও বিরোধিতার ভাব জাগিয়ে তুলুক না কেন, চরিত্রটি আসলে ট্র্যাজিক কারুণ্যে ভাস্বর।

আরও পড়ুন –

Click Here – পথের দাবী গল্পের প্রশ্ন উত্তর

YouTube –Samim Sir

Leave a Comment