আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর // একাদশ শ্রেণী দ্বিতীয় সেমিস্টার // Agun Natok Class 11 Question Answer // Semester 2
আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর
5 মার্ক প্রশ্ন উত্তর
(১) “আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে।”- কার উক্তি, কোন প্রসঙ্গে এই উক্তি ? উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো । ৩+২=৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত সংলাপটি নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে।
বক্তা : চাল সংগ্রহের লাইনের সামনে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসা জনৈক যুবকের উক্তি এটি।
উক্তিটির প্রসঙ্গ : নাটকটির ভিত্তিভূমিতে আছে দুর্ভিক্ষজনিত প্রবল খাদ্যসংকট। সামান্য খাদ্যসংগ্রহ করতেই মানুষ নাজেহাল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেশন দোকানের মাধ্যমে অবশ্য প্রতিদিন সামান্য করে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। লোকে বাধ্য হয়ে ভোরবেলা থেকে সেখানে লাইন দিচ্ছে। একাধিকবার লাইনে ঢোকার অভিযোগে সিভিক গার্ড একজনকে লাইন থেকে বের করে দিতে চায়, তো আর একজনকে চড়ই মেরে বসে। তার সঙ্গে রীতিমতো মারপিট লেগে যায়। মানুষের পেটের খিদে এবং এই অসহায়তার কথা তুলে ধরতেই যুবক চরিত্রটি এমন উক্তি করেছে।
উক্তিটির তাৎপর্য: “আগুন, আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে”-যুবকের এই উক্তিটির মাধ্যমে নাট্যকার আগুন নাটকের মূল প্রতিপাদ্যকেই সামনে তুলে ধরেছেন। আগুন কথাটার মধ্যে একটা চমক আছে। খাদ্যসংগ্রহের জন্যে লাইনে-দাঁড়ানো মানুষগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও এই আগুন শব্দটার উচ্চারণে যেন সংবিত ফিরে পায়। যুবক ব্যাখ্যা দেয়, পেটের আগুনের জ্বালায় এখন সবাই জ্বলছে। সব কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার পিছনে এই পেটের আগুনই। যুবক তথা নাট্যকারে এই সংলাপটি সেই তাৎপর্যই বহন করে।
(২) “এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলিমিশে থাকতে হবে ব্যাস্।”- কোন প্রসঙ্গে, কার উক্তি এটি ? তার এ কথা বলার কারণ কী ? ৩+২=৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত অংশটি বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে চয়ন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গ : দেশজুড়ে চলছে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মন্বন্তরজনিত ভয়ানক খাদ্যসংকট। মানুষ তাই নাজেহাল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় দৈনিক সামান্য করে চাল দেওয়া হচ্ছে রেশন থেকে। কিন্তু তার জন্যে প্রতিদিনই ভোরবেলা থেকে চাল সংগ্রহের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে সবাইকে। সেই লাইনে জোর করে ঢোকার অভিযোগও উঠছে। সিভিক গার্ড সেকারণে কাউকে বের করে দিচ্ছে লাইন থেকে, কাউকে-বা চড় মেরে ভাগিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ সহানুভূতি দেখিয়ে তাদের হয়ে ঝগড়া করছে, আবার কেউ কেউ চরম স্বার্থপরের মতো পিছনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছে। যেমন চতুর্থ পুরুষ চরিত্রটিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন হরেকৃষ্ণবাবু। কিন্তু চালের সংস্থান হওয়ার পর হরেকৃষ্ণবাবু নিজের ভুলটা বুঝতে পারেন এবং ক্ষমা চান সেই দুস্থ লোকটির কাছে। সেই প্রসঙ্গে তৃতীয় পুরুষ চরিত্রটি এ কথা বলেছে।
বক্তা: এই উক্তিটি একজন সাধারণ গরিব মানুষ, নাটকের চরিত্রলিপি অনুযায়ী তৃতীয় পুরুষের উক্তি।
কথাটি বলার কারণ: নাটকের তৃতীয় পুরুষ চরিত্রটি সংকটের পরিস্থিতি-টিকে যথার্থভাবে পড়তে অনুধাবন করতে পেরেছে। পরিস্থিতি যখন কঠিন, দেখা দিয়েছে অস্তিত্বের সংকট, তখন নিজেদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়া না করে একসঙ্গে মিলেমিশে থাকাটাই হবে বাঁচার রাস্তা। নাট্যকারের অভিপ্রায়ও ঠিক তাই।
(৩) ‘আগুন’ নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার সংলাপের মধ্য দিয়ে যে ছবিটি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো। [ সংসদ প্রদত্ত নমুনা প্রশ্ন ] ৫
উত্তর – অসহনীয় খাদ্যসংকটের আবহে লেখা নাটক বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’।
মধ্যবিত্ত সংসারের পরিবেশ: ‘আগুন’ নাটকের চতুর্থ দৃশ্যটির সময় সকালের দিকে, একটা মধ্যবিত্ত পরিবার, তুলনামূলকভাবে একটু পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ পরিবেশ। পেশায় কেরানি হরেকৃষ্ণবাবুর পরিবার। তিনি তাঁর স্ত্রী মনোরমার সঙ্গে কথা বলছেন।
সংলাপের মাধ্যমে খাদ্য সংকটের প্রকাশ : দৃশ্যটির প্রায় শুরুতেই হরেকৃষ্ণবাবুর সংলাপে প্রত্যক্ষ-ভাবে ধরা পড়েছে খাদ্যসংকটের মর্মান্তিক চেহারাটা- “চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।” তবুও তাঁর স্ত্রী তাঁকে চাল সংগ্রহের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। চাল সংগ্রহের জন্যে লাইনে দাঁড়ালে তা পেতে পেতে বারোটা বেজে যাবে, এদিকে দশটার মধ্যে অফিসে পৌঁছতেই হবে, উভয়সংকট। অফিসের ম্যানেজার ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা আবার তাদের জন্যে বরাদ্দ চাল থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে কালোবাজারে চড়া দামে সেই চালই বেচে দিচ্ছে। এ সব জেনেও মনোরমা আশাবাদী হয়ে স্বামীকে ঠাকুর নমস্কার করে বেরিয়ে পড়তে বলে।
অসহায়তার ছবি: হরেকৃষ্ণবাবু এবং তাঁর স্ত্রী মনোরমার সংলাপের মধ্য দিয়ে ‘আগুন’ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য খাদ্য সংকট যেমন উঠে এসেছে, তেমনই উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়তার ছবিও, সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির ম্যানেজার আর তার মোসাহেবদের দুর্নীতির কথাও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
(৪) বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো । [ সংসদ প্রদত্ত নমুনা প্রশ্ন ] ৫
উত্তর –
নামকরণের পদ্ধতি সমূহ: সাহিত্যের নামকরণ নানা প্রকার হতে পারে- চরিত্রকেন্দ্রিক, ঘটনাপ্রধান, ব্যঞ্জনাধর্মী বা বিশেষ তাৎপর্যবাহী। বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটকের ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণ করা হয়েছে।
‘আগুন’ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য: বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের বিষয়বস্তু তথা মূল উপজীব্য হল খাদ্যসংকট। প্রথম দৃশ্যের কৃষকের পরিবার কাকভোরে জেগে উঠে তাদের কিশোর পুত্রকে চাল সংগ্রহের জন্যে পাঠিয়ে দেয় রেশন দোকানের লাইনে। দ্বিতীয় দৃশ্যেও আর-এক কৃষক তার স্ত্রীকে আগেভাগে রেশন দোকানের লাইনে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে। তৃতীয় দৃশ্যে এক শ্রমিক পরিবারের কর্তাকে আগের দিনে চাল না পাওয়ায় বিস্তর ঝগড়াঝাঁটি করতে এবং বউকে মারধর করার পর সেই বউকেই চাল সংগ্রহের লাইনের দিকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। চতুর্থ দৃশ্যেও একই বিষয়। নানা ধর্ম, নানা সম্প্রদায়ের মানুষ লাইন দিয়েছে।
সেই গোলমালের মুহূর্তে এক যুবক ‘আগুন’, ‘আগুন’ বলে চিৎকার করে ওঠে। উৎসুক মানুষদের কৌতূহল মেটাতে সে বলে, “আগুন লেগেছে আমাদের পেটে।” অর্থাৎ খিদের আগুন, খাদ্যাভাবের আগুন জ্বলে পেটে।
সার্থকতা বিচার: ‘আগুন’ শব্দটি এই নাটকে প্রতীকী ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। ‘আগুন’ হয়ে উঠেছে নাটকের কেন্দ্রবিন্দু, মূল প্রতিপাদ্য। তাই সার্বিক বিচারে এই নাটকের ‘আগুন’ নামকরণটিকে সার্থক ও সুপ্রযুক্ত হয়েছে বলেই মনে হয়।
আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর
(৫) “চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।” – এই উক্তিটি কার এবং কোন পরিস্থিতিতে, কেন তিনি এই মন্তব্য করেছেন ? ৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত সংলাপটি বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে।
উক্তির বক্তা: নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে এই উক্তিটি করেছেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা, অফিসের কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু।
পরিস্থিতি ও মন্তব্যের কারণ: দেশজুড়ে প্রবল খাদ্যসংকট চলছে। হাতে টাকা থাকলেও ইচ্ছামতো চাল কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না। টাকা না-থাকলে তো কথাই নেই। ইংরেজ কোম্পানি তথা সরকার রেশনের মাধ্যমে খুব সামান্য পরিমাণের চাল প্রত্যেক দিন একটু একটু করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু গণ্ডগোলটা সেখানেই। এক দিন লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে না-পারলে আর ভাত জুটবে না সেদিনের মতো। এক্ষেত্রে গরিব বা মধ্যবিত্ত সকলের ভাগ্যেরই লেখা এক। ভোর ভোর খাদ্যসংগ্রহের লাইনে না দঁড়ালেও একই দশা। এই সব দেখেশুনে মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা, কেরানিবাবু হরেকৃষ্ণ অধৈর্য ও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন। বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলে ওঠেন “চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।” অর্থাৎ উনানটা। তাও আবার কয়লার অভাব।
তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে শুধু সাধারণ গরিব মানুষদেরই নয়, অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর লোকেদেরও অসহায়তা প্রকাশ পেয়েছে। সহ্য করতে করতে তো এভাবেই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে।
(৬) “যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক।”- কোন প্রসঙ্গে কে এ কথা বলেছেন ? কথাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। ৩+২=৫
উত্তর –
উৎস : আলোচ্য সংলাপটি গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নাটককার বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে চয়ন করা হয়েছে।
বক্তব্যের প্রসঙ্গ: সময়টা হল খাদ্যসংকটের। চারদিকে খাদ্যের জন্যে হাহাকার। সরকার থেকে সামান্য পরিমাণ করে প্রতিদিন রেশন থেকে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই ভোর থেকেই অজগরের মতো লম্বা লাইন। সেখান থেকে চাল সংগ্রহের ব্যাপারে কথা হচ্ছিল এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা, অফিসের কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু ও তার স্ত্রী মনোরমার মধ্যে। কথা প্রসঙ্গে মনোরমা হরেকৃষ্ণবাবুর অফিস থেকে সস্তায় চাল-ডাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা তোলেন। তখনই হরেকৃষ্ণবাবু বিরক্ত হয়ে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করে এই কথাটি বলেছেন।
তাৎপর্য-ব্যাখ্যা: “যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক”-এই কথাটি এসেছে একটি প্রচলিত বাংলা প্রবাদ থেকে। সেটি হল “রক্ষকই ভক্ষক।” তার মানে যার কাজ রক্ষা করা সেই তাকে ভক্ষণ বা অধিগত করে নেয়। এখানে এই প্রবাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হরেকৃষ্ণবাবু বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁর অফিসের কর্তারা কর্মীদের সস্তায় চাল-ডাল দেওয়ার নাম করে সেগুলিকে চড়া দামে বাজারে বিক্রি করে অসৎ পথে আয় করছে। তারা আর রক্ষাকর্তার ভূমিকা পালন করছে না। কথাটার মধ্যে যেমন তীব্র ব্যঙ্গ আছে তেমনই ধিক্কারও আছে কর্তাব্যক্তিদের প্রতি।
(৭) “সহসা দোকানের দরজা খোলে।”- এখানে কোন দোকানের কথা বলা হয়েছে ? কী উদ্দেশ্যে দোকান খোলা হয় এবং দোকান খুললেই-বা সামনে কী দেখা যায় ? ৩+২=৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত অংশটি বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নে উল্লিখিত দোকান: এখানে একটি রেশন দোকানের কথা বলা হয়েছে।
দোকান খোলার উদ্দেশ্য: ১৯৪৩-এ বাংলায় ব্রিটিশ সরকার সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যসংকট চলছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেঁচেবর্তে থাকার জন্যে প্রতিদিন সামান্য পরিমাণ করে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এই ধরনের রেশন দোকান থেকে। সেই উদ্দেশ্যেই দোকান খোলা হয়।
দোকান খুললে যা দেখা যায়: সেই ভোরবেলা থেকেই রেশন দোকানের সামনে লম্বা লাইন পড়েছে। একটু বেলা হলে দোকানের দরজা খোলে। দেখা যায়, মোটা নাদুস-নুদুস দোকানিকে। ফতুয়ার নীচে তার ভুঁড়িটা দৃশ্যমান। দোকানের সামনে সে গঙ্গাজল ছিটোয়। ক্যাশবাক্সের ওপর জ্বলছে ধুনুচি। দোকানি সিদ্ধিদাতা গণেশকে প্রণাম জানিয়ে দাঁড়িপাল্লায় আঙুল ঠেকিয়ে মাথায় ছোঁয়ায়। তারপর সে গদিতে বসে। আর একটা জিনিসও চোখে পড়ে-দরজার পাল্লায় লটকানো বিজ্ঞাপন-খুচরা নাই। দোকানটা খোলার জন্যেই অপেক্ষমান জনতা আগ্রহ নিয়ে উদ্গ্রীব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দোকানটা খোলামাত্র সেই জনতার লাইনে তাই সাড়া পড়ে যায়। লাইন নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে সিভিক গার্ড ঘুরে যায় লাইনের সামনে দিয়ে। আসলে দোকান খোলা মানেই তো লাইনে দাঁড়ানো নিরন্ন মানুষদের চাল পাওয়ার সম্ভাবনা। তাই দোকান খোলাতে সবাই আশার আলো দেখে।
(৮) “ওঃ খুব যে দরদ দেখি।”- কে, কাকে, কোন প্রসঙ্গে এ কথা বলেছে ? কথাটি কী অর্থে বলা হয়েছে ? ৩+২=৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত সংলাপটি বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে।
বক্তা-শ্রোতা: নাটকের পঞ্চম দৃশ্যে চাল সংগ্রহের লাইনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি, চরিত্রলিপিতে যে তৃতীয় পুরুষ, হরেকৃষ্ণবাবুর উদ্দেশ্যে এ কথা বলেছে।
বক্ত্যের প্রসঙ্গ: এই নাটকের পটভূমিতে রয়েছে বাংলার ৪৩-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর। সরকারি ব্যবস্থায় রেশন দোকান থেকে প্রতিদিন সামান্য পরিমাণে চাল দেওয়া হচ্ছে। সেই চাল সংগ্রহ করার জন্যে গরিব-মধ্যবিত্ত সকলেই ভোর থেকেই দাঁড়িয়ে পড়ছে লাইনে। বিশৃঙ্খলাও হচ্ছে খুব। একজন সিভিক গার্ড ব্যাপারটা তদারকি করছে। সেই সিভিক গার্ড দুস্থ চেহারার একজন লোককে চড় মেরে লাইন থেকে বাইরে বের করে দেয়-সে নাকি বারবার লাইনে ঢুকছে বেরোচ্ছে। এই নিয়ে দু-পক্ষের কথা কাটাকাটির মধ্যে অন্যরাও জড়িয়ে পড়ে। হরেকৃষ্ণবাবু সেই লোকটাকে পরামর্শ দেন লাইনে যদি না ঢুকতে দেয় তাহলে আবার পিছনে গিয়ে দাঁড়ানোই হল সহজ সমাধান। সেই কথার উত্তরে চতুর্থ পুরুষ চরিত্রটি এ কথা বলেছে।
বক্তব্যের অর্থ: তৃতীয় পুরুষের ‘ওঃ খুব যে দরদ দেখি’ কথাটির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ব্যঙ্গের সুর আছে। আসলে পাঁচশো জনের পিছনে নতুন করে দাঁড়ানো মানে কার্যত চাল না পাওয়ারই শামিল। এ কথা সে বিলক্ষণ জানে বলেই এই ব্যঙ্গ করেছে।
আগুন নাটকের প্রশ্ন উত্তর
(৯) বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা করো। ৫
[অথবা],
বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করো। ৫
[অথবা],
বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকে নাট্যকার কোন সত্য অনুসন্ধান করেছেন-তার পরিচয় লিপিবদ্ধ করো। ৫
উত্তর –
ভূমিকা: গণনাট্য যুগের প্রধান নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর প্রথম নাটক ‘আগুন’।
নাটকের বিষয়বস্তু / মূল প্রতিপাদ্য: ‘আগুন’ নাটকের প্রেক্ষাপট হল পরাধীন ভারতবর্ষ আর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল মন্বন্তরজনিত খাদ্যসংকট। চরম খাদ্যসংকটে সরকার রেশন দোকানের মাধ্যমে প্রতিদিন সামান্য পরিমাণ খাদ্যবস্তু দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আর সেই জন্যে প্রতিদিন ভোরবেলা থেকে গরিব, মধ্যবিত্ত সবাই লাইনে শামিল হচ্ছে। লাইন দেওয়া ও সামগ্রী পাওয়ার জন্যে ঝগড়া, লড়াই, চরম বিপর্যয়ের অবস্থা। খাদ্যসংকটের জীবন্ত ছবি নাট্যকার এই নাটকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গেই তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেই চিত্রের মধ্য দিয়েই তিনি পৌঁছোতে চেয়েছেন এক জীবনসত্যে। একদিকে তিনি তাঁর নাটকের হরেকৃষ্ণ চরিত্রটি সংলাপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করছেন-“চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।” অন্যদিকে জনৈক যুবকের বলা “আগুন! আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে”-এই সংলাপের মাধ্যমে পৌঁছে যেতে চেয়েছেন নাটকের মূল লক্ষ্যে। ঠিক তেমনই তৃতীয় পুরুষ চরিত্রটির কণ্ঠে “…এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে ব্যাস্।” এই সংলাপের মাধ্যমে বেঁধে বেঁধে থেকে মিলেমিশে থেকে সংকটসমুদ্র পার হওয়ার, জীবনসত্যে উপনীত হওয়ার প্রয়াস করেছেন। নাটকটি একটি বিশেষ কালখণ্ডের সমস্যা ও সংকট নিয়ে শুরু হলেও চিরকালীন সত্যসন্ধানী হয়ে উঠেছে।
(১০) “কাল সারাটা দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুলকি আর ওর মা তো শুধু হাতে ফিরে এসেছে।”- ফুলকি কে ? ফুলকিরা কাল কোথায় গিয়েছিল এবং সেখান থেকে তারা শুধু হাতে ফিরে এসেছে কেন ? ২+৩=৫
উত্তর –
উৎস: আলোচ্য সংলাপটি গণনাট্য-যুগের প্রধান নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে চয়ন করা হয়েছে।
ফুলকির পরিচয়: ফুলকি হল নাটকের একটি বিশেষ চরিত্র এবং কারখানার শ্রমিক সতীশের মেয়ে। সে খুব ঘুমকাতুরে। এই নিয়ে সতীশের খুব রাগ ।
ফুলকিদের গন্তব্যস্থান: প্রবল খাদ্যসংকটে সবাই জেরবার। দু-মুঠো চাল পাওয়ার জন্যে গরিব, মধ্যবিত্ত সবাই রেশন দোকানের সামনে চাল সংগ্রহের লাইনে শামিল। সতীশের পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে ‘ওরা’ হল সতীশের মেয়ে ফুলকি আর ওর মা ক্ষিরি। ওরাও সকলের মতো কাল চাল সংগ্রহের জন্যে রেশন দোকানের সামনে লাইন দিতে গিয়েছিল।
শূন্য হাতে ফেরার কারণ: আসলে গতকাল ফুলকি আর তার মা রেশন দোকানের সামনে চাল সংগ্রহের লাইনে দাঁড়াতে দেরি করে ফেলেছিল। ফলে রেশনের লাইনে ওদের জায়গায় ছিল একেবারে শেষের দিকে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ থাকায় ওরা রেশন দোকানের কাছে গিয়ে চাল সংগ্রহ করার আগেই চাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সারাটা দিন লাইনে দাঁড়িয়েও ওদের ভাগ্যে এক মুঠো চালও জোটেনি। বাধ্য হয়ে মিস্ত্রির কাছ থেকে ‘প’ দেড়েক চাল ধার নিয়ে ওদের কোনোমতে খিদে মেটাতে হয়েছিল। ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে চাল সংগ্রহের লাইনে না দাঁড়াতে পারার জন্যেই এই বিড়ম্বনা, বঞ্চনা।
(১১) ‘আগুন’ নাটকটি কোন শ্রেণির উল্লেখ করে নাটকটির গঠনতন্ত্রের অভিনবত্ব কোথায় আলোচনা করো । ৫
উত্তর –
উৎস: প্রখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটকটি একটি একাঙ্ক শ্রেণির নাটক।
গঠনতন্ত্রের অভিনবত্ব: গঠনতন্ত্রের দিক থেকে বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকটি অত্যন্ত অভিনব এবং মৌলিক। এই একাঙ্ক নাটকটিতে পাঁচটি দৃশ্য রয়েছে। চারটি দৃশ্য ভোর ও সকালবেলার, একটি দৃশ্য দিনের বেলাকার। এই নাটকের প্রথম চারটি খণ্ডদৃশ্য পরস্পরের থেকে আলাদা ভিন্ন ভিন্ন। তা হলেও যোগসূত্র কিন্তু একটা আছেই। সেটা হল প্রতিটি দৃশ্যের একজন করে করে মানুষকে প্রতিনিধি হিসেবে নাট্যকার রেশন দোকানের লাইনের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। আর পঞ্চম দৃশ্যটি তো রেশন দোকানের সামনে চাল সংগ্রহের লাইনকে ঘিরেই। এটি হল অনেকগুলি বিচ্ছিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতির এক ‘প্যানোরেমিক ফর্ম’। এখানে পাঁচটি খণ্ডদৃশ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন চরিত্রের ভিতরকার চিত্রকে পর্যবেক্ষণ করেছেন নাট্যকার।
প্রথম চারটি দৃশ্যেরই অবস্থা ভিন্ন হলেও সমস্যা একই। সেই কারণে অভিমুখও এক। চালের অভাব, তাই চাল সংগ্রহের লাইনে শামিল হওয়া। পঞ্চম দৃশ্যে এসে পরস্পরের ইনটার্যাকশন-সংযোগ ও সংঘাত। কথা, কথান্তর, মারপিট। তার মধ্যেই এক যুবকের ‘আগুন’ অর্থাৎ ‘পেটে আগুন’ লাগার ঘোষণা নাটকের মূল প্রতিপাদ্য। কিন্তু প্রগতিশীল সমাজভাবনার নাটক বলে এই নাটকের পরিসমাপ্তি হয়েছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরস্পর সহযোগিতা ও মিলেমিশে থাকার আহ্বান দিয়ে।
ছোটো পরিসরে নাটকটি তাই গঠনতন্ত্রের বিচারে যথেষ্ট অভিনবত্বের দাবি রাখে।
(১২) “অস্পষ্ট আলোয় কিছুই ভালো করে ঠাহর করা যাচ্ছে না।” – কোন নাটকের, কোন্ দৃশ্য এটি ? অস্পষ্ট আলোয় মঞ্চের ঘটনাবলি দর্শকের সামনে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ? ২+৩=৫
উত্তর –
প্রাসঙ্গিক দৃশ্য: উদ্ধৃত সংলাপটি বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি নাটকের প্রথম দৃশ্যের অংশ।
উপস্থাপিত ঘটনাবলির ক্রম: বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’-এর প্রথম দৃশ্যের এই সংলাপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ, পরিস্থিতিটি অদ্ভুত। সময়-প্রত্যুষ কাল। আকাশ আলোকিত হয়নি, তাই অস্পষ্ট আলোয় কিছুই ভালো করে ঠাহর হচ্ছে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে না। তবুও স্বল্প আলোয় গরিব ঘরের সাংসারিক টুকিটাকি জিনিপত্তরগুলো আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। রীতিমতো অপরিচ্ছন্ন, নোংরা পরিবেশের মাঝখানে দেখা যায় একটা মেটে জালা। তারই গা ঘেঁসে একটা বাঁশের আলনার ওপর দেখা যায় ঝুলন্ত দু-একখানা নোংরা কাপড়, একটা ছেঁড়া চট, আর একখানা পুরোনো ছেঁড়া কাঁথা। খুব অস্পষ্ট নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে মেঝের ওপর জনা তিনেক লোক কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে।
এই সব দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোরের সময়-জ্ঞাপক কিছু শব্দও। যেমন একটি মোরগের ডেকে ওঠা, দূর গাঁয়ের থেকে ভেসে আসা আজানের শব্দ, আড়মোড়া ভেঙে কারও হাই তোলার শব্দ ইত্যাদি। এই সমস্ত কিছু মিলে একটি অব্যর্থ ভোরের দৃশ্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন নাট্যকার।
(১৩) “কুম্ভকর্ণ আর বলে কাকে।”- কোন নাটকের সংলাপ এটি এবং কুম্ভকর্ণই-বা কে ? কে, কাকে, কেন এ কথা বলেছে ? ২+৩=৫
উত্তর –
উৎস: উদ্ধৃত সংলাপটি গণনাট্য যুগের প্রধান নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে চয়ন করা হয়েছে।
রামায়ণের কুম্ভকর্ণ: কুম্ভকর্ণ হল রামায়ণ মহাকাব্যের রাবণ রাজার ভাই। তিনি পাহাড়ের মতো শরীরের অধিকারী আর ছ-মাস করে ঘুমিয়ে কাটাতেন।
বক্তা-শ্রোতা : ‘আগুন’ নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে এই সংলাপটি নাটকের অন্যতম চরিত্র কারখানার শ্রমিক সতীশ তার ঘুমন্ত মেয়ে ফুলকি আর তার মায়ের উদ্দেশে বলেছে।
কুম্ভকর্ণ বলার কারণ: সময়টা খাদ্যসংকটের। কোথাও চাল পাওয়া যাচ্ছে না। শুধুমাত্র রেশন দোকানেই প্রতিদিন যৎসামান্য দু-সের করে চাল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেঁচেবর্তে থাকার জন্যে সেই সামান্য চাল সংগ্রহের কারণে ভোর থেকেই সেখানে লম্বা লাইন পড়ছে। সবাই সামনে দাঁড়াতে চায়। কারণ পিছনের দিকে = দাঁড়ালে হয়তো ভাগ্যে চাল নাও জুটতে পারে। কিন্তু সতীশের বাড়িতে সে-বিষয়ে কোনো হেলদোল নেই। ঘরের ভেতরে সতীশের মেয়ে ফুলকি আর তার মা ক্ষিরি সব ভুলে কুম্ভকর্ণের মতো অকাতরে ঘুমোচ্ছে। কোনো হুঁশ নেই তাদের, ভোর ভোর চাল সংগ্রহের লাইনে গিয়ে না-দাঁড়ালে তো খাওয়াদাওয়াই হবে না! এজন্য তাদের অকাতরে ঘুমোতে দেখে সতীশ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে কুম্ভকর্ণের ঘুমের সঙ্গে তুলনা করে তাদের দোষারোপ করে। আসলে ঠিক আগের দিনই পিছনের দিকে লাইন দিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বলে চাল না-পাওয়ার আতঙ্কে কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছে কারখানার শ্রমিক সতীশ।
(১৪) “কিন্তু এদিকে যে ভারি মুশকিলেই পড়লাম।”- কে, কাকে এ কথা বলেছে ? মুশকিলটা কীসের ? ২+৩=৫
উত্তর –
উৎস, বক্তা-শ্রোতা: উদ্ধৃত সংলাপটি বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’-এর তৃতীয় দৃশ্য থেকে নেওয়া হয়েছে। নাটকের অন্যতম একটি চরিত্র কারখানার শ্রমিক সতীশ তার সহকর্মী জুড়োনকে এ কথা বলেছে।
মুশকিল পরিস্থিতি: এখানে যে মুশকিলের কথা বলা হয়েছে তা সত্যি সত্যিই খুব গুরুতর। প্রবল খাদ্যসংকট চলছে। চারদিকে চালের জন্যে হাহাকার। প্রতিদিন রেশন দোকান থেকে খুবই সামান্য পরিমাণে চাল দেওয়া হচ্ছে। সে চালে একদিনের বেশি চলছে না। তাই আবার পরের দিন ঠিক লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু মুশকিলের ওপরও মুশকিল আছে। দেরি করে গিয়ে লাইনের শেষের দিকে দাঁড়ালে আবার ভাগ্যে চাল নাও জুটতে পারে। আগের দিনই সতীশের মেয়ে ফুলকি আর তার বউ ক্ষিরির ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছিল। শেষে মিস্ত্রির কাছে ‘প’ দেড়েক চাল ধার নিয়ে কোনোরকমে পেটের খিদে সামলাতে হয়। জুড়োনের অবশ্য সেই সমস্যা নেই। যেহেতু সে একলা মানুষ, তাই দু-চার পয়সা বেশি দিয়ে হোটেলে খেয়ে – নিতেও কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু পরিবার সমেত সতীশের সে উপায় নেই। অত টাকা সে পাবে কোথায়? তাই ভোর ভোর রেশন দোকানের সামনে চাল সংগ্রহের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই তার। সমস্যা হল সতীশকে রোজগারের জন্যে কারখানায় যেতেই হবে। এদিকে বউ আর মেয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে যা বড়োই মুশকিলের ব্যাপার।
(১৫) “কিছু মনে করো না যেন ভাই”- এই উক্তিটি কার এবং নাটকে বক্তার কীরূপ চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় ? ৫
[অথবা],
‘আগুন’ নাটক অবলম্বনে হরেকৃন্ষবাবুর চরিত্রটি সংক্ষেপে লেখো । ৫
উত্তর –
উৎস: উল্লিখিত সংলাপটি বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন’ নাটক থেকে নেওয়া হয়েছে।
বক্তা: প্রশ্নোদ্ভূত উক্তিটি নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র হরেকৃষ্ণবাবুর।
বক্তার চরিত্র: হরেকৃষ্ণবাবু একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান সদস্য। অফিসের কেরানি। তাঁদের অবস্থা নাটকের অন্যান্য চরিত্রের তুলনায় কিছুটা সচ্ছল।
আলস্য ও ধৈর্যহীনতা: হরেকৃষ্ণবাবু একটু অলস স্বভাবের মানুষ, তাঁর ধৈর্যশক্তিও কম। অল্পতেই তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন। স্ত্রী মনোরমাকে তিনি স্পষ্ট করে বলেন-“চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।”
অসহায়তা: আসলে তিনি কিছুটা অসহায়ও। দশটার মধ্যে অফিসে যাবেন, না চাল সংগ্রহের জন্যে দাঁড়িয়ে বেলা বারোটা পার করবেন-কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না।
প্রতিবাদী মানসিকতা: আবার তিনিই অফিসের কর্তাদের কর্মীদের জন্যে বরাদ্দ চাল কালোবাজারির বিরুদ্ধে সরব হন।
স্বার্থপরতা: এই হরেকৃষ্ণবাবুই চাল সংগ্রহের জন্যে লাইনে থাকা একজন লোককে সিভিক গার্ড মেরে বের করে দিলে তিনি চরম স্বার্থপরের মতো তাকে আবার পিছনে গিয়ে দাঁড়াতে পরামর্শ দেন।
ভুল স্বীকারের মানসিকতা: পরে অবশ্য নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার কাছে ক্ষমা স্বীকারও করে নেন। সব মিলিয়ে হরেকৃষ্ণ চরিত্রটি এখানে ভালোয়-মন্দয় মেশানো বাস্তব মধ্যবিত্ত চরিত্র।
(১৬) ‘আগুন’ নাটকে পাঁচটি দৃশ্যে খিদের যন্ত্রণা যেভাবে ফুটে উঠেছে তার পরিচয় দাও ।
উত্তর –
পঞ্চদৃশ্যে খিদের যন্ত্রণা : মন্বন্তরের ভয়াবহ দিনগুলোতে মানুষের খিদের যন্ত্রণা ও অসহায়তা ‘আগুন’ নাটকের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। নাটকের পাঁচটি দৃশ্যে আলাদা আলাদা চরিত্র, তাদের পটভূমি ভিন্ন; কিন্তু এক জায়গায় সকলেই মিলে গেছে, তা হল খিদের যন্ত্রণা। প্রথম দৃশ্যে ছেলের ঘুম ভাঙিয়ে নেত্যর মা বাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, কিছু আনাজ বিক্রি করে রেশনের চাল কিনতে যাবে বলে। আর নেত্যর বাবা সংশয়ী হয়ে বলে, দেরি হয়ে যাওয়ায় “চাল আজ আর পাতি হবে নানে…”। দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষাণ তার স্ত্রীকে পরামর্শ দেয় কেষ্টর মা-র সঙ্গে আগে গিয়ে লাইনের একেবারে প্রথমে দাঁড়ানোর জন্য। অন্নের জন্য এই কাতরতা তীব্র হয়ে ওঠে তৃতীয় দৃশ্যে সতীশের বাড়িতে। সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে চাল না পাওয়ায় সেই রাতে চাল ধার করে আনতে হয় খাওয়ার জন্য এবং সকালে কারখানার কাজে যাওয়ার আগে সতীশের জন্য সামান্য খাবারও অবশিষ্ট থাকে না। চতুর্থ দৃশ্যে হরেকৃয়বাবু আক্ষেপ করেন- “চা নেই, চিনি নেই, চাল নেই, খালি আছে চুলোটা।” আর পেটে খিদের এই আগুন নিয়েই পঞ্চম দৃশ্যে রেশনের দোকানে লাইন দেয় সমাজের ভিন্ন ধর্ম বা জাতির নানা মানুষ। খিদের তাড়না যেন তাদের সকলকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলি সিভিক গার্ডের জুলুমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রুখে দাঁড়ায়। পেটের আগুন যেন প্রতিবাদের আগুন হয়ে ওঠে। যে আগুন এক কিশোরকে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেয় না, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে বিপর্যস্ত করে, সেই আগুনই যেন রেশনের দোকানের লাইনে পারস্পরিক সহমর্মিতার সূত্রে মনুষ্যত্বকে নিকষিত হেম করে তোলে।
আরও পড়ুন –
লালন শাহ ফকিরের গান প্রশ্ন উত্তর
ভাব সম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর
তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্প প্রশ্ন উত্তর
YouTube – Samim Sir