নুন কবিতার বড় প্রশ্ন উত্তর // জয় গোস্বামী // nun kobita question answer // class 11 bengali semester 2 // WBCHSE
নুন কবিতার বড় প্রশ্ন উত্তর
Mark – 2 + 3
(১) “আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।” – কাদের উদ্দেশ্যে, কে এই দাবি রেখেছে ? এমন দাবি রাখার কারণ কী ? ২+৩=৫
উত্তর – যারা, যাদের উদ্দেশ্যে: জয় গোস্বামী ‘নুন’ কবিতার এই পঙক্তিটি সমাজের শাসকশ্রেণি তথা আবহমানকালের উচ্চবিত্ত ধার্মিক শ্রেণির উদ্দেশ্যে সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রমিক ও সর্বহারার দল এই দাবি রেখেছে। নিম্নবিত্তের শ্রমজীবীরা বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন পরিপূরণের প্রত্যাশায় ও আগামীতে এমন পরিস্থিতির অবসাদের বাসনায় সর্বহারা অল্পে খুশি থাকা মানুষ শোষক-শাসক আর উচ্চবিত্তদের কাছে এই দাবি রেখেছে।
দাবির কারণ: না খেয়ে মরার জন্য পৃথিবীতে কেউ জন্মায় না। তাই যতই বিরুদ্ধ প্রতিবন্ধকতা আসুক না কেন প্রাণীরা তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে চিন্তাশীল মানুষও যে তাই করবে তাতে সন্দেহ নেই। তারা পরিশ্রমের দ্বারা সেই রসদ জোগাড় করতে ব্যর্থ হলে ধারদেনা, অনুরোধ-উপরোধ এমনকি চুরিচামারিও করে। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ গণতন্ত্র ও আইনশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উপায়-পদ্ধতি কঠোর হাতে দমন করে। আর সেসবের বেশিরভাগই প্রয়োগ হয় হতদরিদ্র নিম্নবিত্ত মানুষের উপর। অথচ সভ্যসমাজে আইনের ফাঁকফোকর গলে উচ্চবিত্তের মানুষ খুন-রাহাজানি ও সংঘটিত সুপরিকল্পিত অন্যায় থেকে রেহাই পায়। সাধারণ মানুষের কাছে এমন দুর্বিনীত বেপরোয়া হওয়া সম্ভব হয় না। তারা কেবল আবেদন-নিবেদন, অনুরোধ-উপরোধের দ্বারা প্রত্যাশা পূরণের মিনতি জানাতে পারে। আর সেকারণেই অসহায় দুর্বল মানুষের প্রতিনিধি স্বরূপ বক্তার এমন দাবি পেশ।
(২) “আমরা তো সামান্য লোক,”- ‘সামান্য লোক’ কারা ? তারা নিজেদেরকে এমন বিশেষণ বা অভিধা দিয়েছেন কেন ? ৩+২=৫
উত্তর – সামান্য লোক যারা: জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতার এই পঙক্তির ‘সামান্য লোক’ শব্দটি কতিপয় বা কম সংখ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। মূলত আর্থিক অনটনে ক্লিষ্ট নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই শ্রেণির মানুষ অল্পে খুশি এবং অসুখে ধারদেনার মধ্যে জীবন কাটালেও জগৎ ও জীবন সম্পর্কে একটা পবিত্র ধারণা পোষণ করে। আবার ধারদেনায় কষ্টসৃষ্টে জীবনযাপন করলেও দৈনন্দিন জীবনে এরা কমবেশি মাদকাসক্ত থাকে। উপার্জনহীন অবস্থায় গভীর রাতে বাড়ি ফিরে ঠান্ডাভাতে নুন না পেয়ে বাবা-ছেলে মিলে প্রচণ্ড ঝগড়া করে সারাপাড়া মাথায় তোলে। প্রতিবেশীদের চরম বিরক্তির কারণ হয়েও সদম্ভে বলতে পারে-ঝগড়া করি তো অন্য সবার কী যায় আসে। এই অবস্থায় সমাজে তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে-তারা সমাজের গণ্যমান্য অভিজাত মানুষ নয়, তারা কেবল ঠান্ডাভাতে লবণের প্রত্যাশী অনভিজাত নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষ-সামান্য লোক।
এমন অভিধার কারণ: নিজেদের ‘সামান্য লোক’ অভিধায় ভূষিত করার প্রথম ও প্রধান কারণ ক্ষুধার জ্বালা। সামাজিক বৈষম্য ও আর্থিক দুর্বলতার জন্য কোথাও ন্যূনতম মানবিক সম্মান পায় না। অথচ এদের পরিশ্রমের ফসলে অভিজাতদের বিলাস-বৈভব। সবকিছু জেনেও ক্ষমতাহীনতার জন্য এরা দুর্বল ও অসহায়। আর এই চরম অসহায়তা থেকে নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষ নিজেদেরকে ‘সামান্য লোক’ অভিধায় ভূষিত করে।
(৩) “আমরা তো অল্পে খুশি;”– ‘আমরা’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন ? তাদের ‘অল্পে খুশি’ থাকার কারণ ব্যাখ্যা করো। ২+৩=৫
উত্তর – যাদের বোঝানো হয়েছে: কবি জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতার উদ্ধৃত এই পঙ্ক্তিতে ‘আমরা’ বলতে কবি সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত নিম্নবিত্ত মানুষদেরকে বুঝিয়েছেন। এই শ্রেণির মানুষ সামাজিক নানান বৈষম্যের শিকার হয়ে অতি সাধারণভাবে দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলে। প্রতিদিনের ন্যূনতম বাঁচার রসদ জোগাড় করে কঠোর কায়িক পরিশ্রম করে। এতসব প্রচেষ্টার পরেও এই ‘আমরা’ শ্রেণির মানুষ ঠান্ডা ভাতে লবণটুকু জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়।
‘অল্পে খুশি’ থাকার কারণ: সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষ হাজারও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে আবহমানকালের ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এই শ্রেণির মানুষ কোনোদিন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না। ফলে বেঁচে থাকার জন্য এরা সমাজের উচ্চবিত্ত, অভিজাত ও ধনিকগোষ্ঠীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাতেও এদের কোনো সুরাহা নেই। এমনকি শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকার দরুন নিম্নবিত্ত এই শ্রমজীবী পরিশ্রমী মানুষ কোনোকালে – নিজেদের অধিকারটুকু বুঝে নিতে পারে না। কেবল নিজেদের দুর্ভাগ্যের জন্য ঈশ্বরকে দায়ী করেই গতানুগতিকভাবে জীবন কাটাতে তৎপর থাকে, ভাগ্য বদলের কথা ভাবে না। তা ছাড়া উচ্চবিত্তের চিরকালীন শোষণ কৌশলের কাছে সম্পূর্ণ পরাস্ত – ও বিধ্বস্ত হয়ে, তারা আমরণ ‘অল্পে খুশি’ থাকার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে।
(৪) নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণার যে ছবি ‘নুন’ কবিতায় পাওয়া যায় তা সংক্ষেপে লেখো। ৫
[ অথবা ],
নুন’ কবিতায় কবি নিম্নবিত্ত মানুষের যে জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন তা পরিস্ফুট করো।
উত্তর – ‘নুন’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনযন্ত্রণার চিত্র : মানুষমাত্রই বাঁচার অধিকারী। আর নিতান্ত সাধারণ-ভাবে বাঁচতে অবশ্যই চাই অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান। কিন্তু সবার আগে চাই অন্ন। কিন্তু শুধু অন্নে তো হয় না, তাকে খাবার উপযোগী করতে চাই নুন-অর্থাৎ লবণ। নুন ব্যতীত শুধু নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর নয়-উচ্চবিত্ত-সহ অন্য সব মানুষের জীবনের স্বাদ থাকে না। শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষ, তাই ভাত আর নুনের জন্য লড়াই করে নিরন্তর। তাই কবিতার কথক ঠান্ডা ভাতে নুন না পেয়ে বাপব্যাটা রাতদুপুরে ঝগড়া করে পাড়া মাথায় করে প্রশ্ন তোলে-“করি তো কার তাতে কী”-কিংবা সামান্য লোক হিসেবে সমাজের কাছে দাবি জানায়- “আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।” আসলে শ্রমজীবী মানুষ নির্ঝঞ্ঝাট ঝামেলাহীন জীবন পছন্দ করে বলে তারা অল্পে খুশি থেকে সাধারণ ভাতকাপড়কে সম্বল করে অসুখে ধারদেনায় বেঁচেবর্তে থাকে। সেইসঙ্গে মনে স্বাভাবিক সৌন্দর্য সচেতনতা বজায় রেখে মাত্রাছাড়া বাজারের দিনে গোলাপচারা কিনে আনে এবং অকারণ দুশ্চিন্তার শিকার হয়। এটাও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবনযন্ত্রণার অন্য এক প্রতিচ্ছবি। এভাবে শ্রমজীবী মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে ঘরেবাইরে লড়াই করে নিজেদের যন্ত্রণাবহুল জীবনযাপনের ছবি ফুটিয়ে তোলে।
(৫) “সবদিন হয় না বাজার, হলে হয় মাত্রাছাড়া”- বক্তার সবদিন বাজার না-হওয়ার কারণ কী ? ‘মাত্রাছাড়া’ বাজার হওয়া ব্যাপারটি কী বুঝিয়ে দাও। ২+৩=৫
উত্তর – সবদিন বাজার না হওয়ার কারণ: জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতা থেকে নেওয়া পঙক্তিটির কথকের সবদিন বাজার না হওয়ার প্রথম ও প্রধান কারণ তাদের অমিতব্যয়িতা ও অপরিণামদর্শিতা। শ্রমজীবী এই মানুষ মূলত দিন আনা দিন খাওয়া গোত্রের। আগাম কোনো বিরূপতা- তাদের শারীরিক ক্ষমতা কমতে পারে কিংবা উপার্জন না হওয়া-এসব নিয়ে তারা ভাবে না। বরং তারা আজকের দিনকে ভালো করে ভোগ করার জন্য সব উপার্জন খরচ করে। আগামীদিনের সম্ভাব্য অনুপার্জনের জন্য তাদের সবদিন বাজার হয় না।
‘মাত্রাছাড়া বাজার’ কী: ‘মাত্রাছাড়া বাজার’ কথাটির সহজ অর্থ হল অনাবশ্যক, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা। বিশেষ করে হাতে উদ্বৃত্ত পয়সা জমা হওয়ার দিনে বক্তা এমন অবিবেচকের মতো কাজ করে ফেলে। মনে আবেগসর্বস্ব ভাবনার উদ্রেক ঘটে। ঘরে বসে গোলাপের সৌন্দর্য ও ঘ্রাণ পাওয়ার আশায় সে পরিকল্পনা ছাড়া গোলাপচারা কিনে আনে। কোথায় চারাটি পুঁতবে, পরিচর্যার কোনো সময় বা পদ্ধতি পাবে কিনা, এমনকি গাছটিতে আদৌ ফুল হবে কি না, তাও অজানা। অতএব অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা তার মনকে আক্রমণ করে। ফলে বোঝা যায় হাতে অতিরিক্ত পয়সা থাকায় গোলাপচারা কেনার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি কিছু দুশ্চিন্তা তার মাথায় ঢোকে। আর এই দুশ্চিন্তার মেঘ সরাতে বক্তা গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে। আর সেটিও তাকে কিনতে হয়। এসবই তার প্রয়োজন অতিরিক্ত জিনিস, তাই মাত্রাছাড়া বাজার।
(৬) “রাগ চড়ে আমার মাথায়, আমি তার মাথায় চড়ি,” – বক্তার এই আচরণের স্বরূপ / তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। ৫
উত্তর – স্বরূপ তাৎপর্য/আচরণের কারণ: শ্রমজীবী মানুষের প্রাত্যহিক কাজ নির্ভর করে মালিক তথা ধনিক শ্রেণির হাতে। ফলে কাজ না হওয়ার সঙ্গে অনাহারের সম্বন্ধ হয়ে পড়ে তাদের কাছে নিত্যসম্বন্ধী বিষয়। তার উপর এই শ্রেণির মানুষ ভীষণ অমিতব্যয়ী ও অপরিণামদর্শী। আগামী দিনের ব্যাপারে কোনো আগাম ধারণা করে আজকের উপার্জন থেকে কিছুটা সঞ্চয় রাখতে তারা উদ্যোগী হয় না। বরং কোনোভাবে অতিরিক্ত উপার্জিত হলে তারা মাত্রাছাড়া বাজার করার সঙ্গে গোলাপচারা কিনে আনে। তারা ভেবে দেখে না-চারাটি কোথায় পুঁতবে? কীভাবে পরিচর্যা করবে? তাতে আদৌ ফুল ফুটবে কি না ইত্যাদি। আর যখনই এই ভাবনা মনে ঢোকে তখনই ভেতরে ভেতরে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। মনের সেই দ্বিধা থেকে চরম অশান্তি ও অস্থিরচিত্ততা আসে। তারপর উপার্জনহীন দিনে দুপুররাতে বাড়ি ফিরে দ্যাখে ঠান্ডা ভাতে নুনটুকুও নেই। ফলে মাথায় রাগ চড়ে-বাবার সঙ্গে ক্রোধে উন্মত্ত দুই ভাইয়ের মতো কলহে লিপ্ত হয়। এইসময় প্রতিবেশীদের ভাবনাটুকু রাগের আগুনে পুড়ে ছাই হয়। চিৎকার-কলহে ক্রোধ ও তার প্রকাশ ক্রমশ বেড়ে যায়। পরিশেষে নিজেরাই বুঝিয়ে দেয় তাদের সামান্যতম চাহিদার কারণ ও স্বরূপ। তারা সামান্য লোক, তারা তাদের ঠান্ডা ভাতে সামান্য লবণের ব্যবস্থাই চায়। এটা হলে মাথায় রাগ চড়বে না-প্রতিবেশীরাও নিশ্চিন্ত থাকবেন।
(৭) “মাঝে মাঝে চলেও না দিন, বাড়ি ফিরি দুপুররাতে,”- কোন পরিপ্রেক্ষিতে কথাটি বলা হয়েছে ? দুপুররাতে বাড়ি ফেরার পর কী ঘটে ? ৩+২=৫
উত্তর – পরিপ্রেক্ষিত: জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতা থেকে নেওয়া প্রশ্নোক্ত উক্তিটির পরিপ্রেক্ষিত হল- নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন প্রক্রিয়া। অবশ্য ব্যাপারটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। একদিকে নিম্নবিত্ত মানুষের অসহনীয় নিরন্নপ্রায় জীবনযাপন, অন্যদিকে উচ্চবিত্ত মানুষের বিলাসবহুল জীবনচিত্র। নিম্নবিত্ত মানুষরা সম্পূর্ণভাবে শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। কাজ করে উপার্জন হলে এরা খেতে পায়, নতুবা অনাহার তাদের ভবিতব্য। এরা সঞ্চয়ে আগ্রহী নয়-ভবিষ্যতের কথা ভেবে গচ্ছিত রাখতে চায় না। বরং অতিরিক্ত কিছু পেলে মাত্রাতিরিক্ত বাজার করে। এমনকি আগুপিছু না ভেবে গোলাপচারা কিনে আনে। পরক্ষণেই মনে দ্বন্দ্ব জন্মায়-তা কোথায় লাগাবে? তাতে আদৌ ফুল হবে কি না? এমত পরিস্থিতিতে বাড়ির অন্যান্যদের থেকে নিজের অসহায়তা গোপন রাখতে এবং পাড়াপ্রতিবেশীদের থেকে নিজেদের দুরবস্থা লুকিয়ে রাখার পরিপ্রেক্ষিতে কথাটি বলা হয়েছে।
দুপুররাতে ফেরার প্রতিফল: দুপুররাতে বাড়ি ফিরে তারা চরম অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে। ঠান্ডা ভাতে নুন না পেয়ে বাপব্যাটা মিলে তুমুল কলহে লিপ্ত হয়। তখন পিতাপুত্রের স্বভাবে সম্ভ্রমাত্মক দূরত্ব থাকে না। স্বার্থান্ধ দুই ভাইয়ের মতো প্রতিবেশীদের আমল না দিয়ে সোচ্চারে বলে দেয়- “সারা পাড়া মাথায় করি” এবং “করি তো কার তাতে কী?” আসলে উপার্জনহীনতা জনিত ক্ষুধার যন্ত্রণায় তারা সাময়িক উন্মত্তের আচরণ করে।
(৮) “চলে যায় দিন আমাদের অসুখে ধারদেনাতে,”- বক্তার এমন অভিমতের কারণ কী ? ‘অসুখে ধার-দেনাতে’ দিন চালানোর মাধ্যমে বক্তার চরিত্রের কোন দিকটি প্রকাশ পায় ? ৩+২=৫
উত্তর – বক্তার অভিমতের কারণ: সমাজে ‘অল্পে খুশি’-থাকা আর ধারদেনায় অসুখে-বিসুখে টিকে থাকা মানুষগুলি নিতান্ত নিম্নবিত্ত অতি সাধারণ শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের ভাবনাচিন্তার মধ্যে কোনোরকম কপটতা থাকে না-থাকে না অন্যকে বঞ্চিত করে মুষ্টিমেয় শ্রেণির ভাবনায় উন্নীত হয়ে থিতু থাকার চেষ্টা। এই শ্রেণির মানসভূমিতে ব্যক্তিক ভাবনার চেয়ে সমষ্টির চেতনা প্রাধান্য পায় বলে হাজারও কষ্ট সহ্য করে জীবনে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যায়। শারীরিক পরিশ্রমই এদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু পরিশ্রমী হওয়া সত্ত্বেও নানান প্রতিবন্ধকতায় এরা হার মেনে সাময়িকভাবে ছুটি নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু পোড়া পেটের তো খাবার চাই। এ কারণেই ‘নুন’ কবিতার বক্তার এমন অভিমত।
বক্তার চরিত্রের দিক: ‘অসুখে ধারদেনাতে’ দিন চালানোর মাধ্যমে বক্তার চরিত্রের প্রথম যে দিকটি প্রকাশ পায় তা হল জীবনধর্মিতা। বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ নিয়ে তারা কাজ করে চলে। অল্পে খুশি থাকা মানুষগুলি সাধারণ ভাতকাপড় জোগাড় করতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে বাধার সম্মুখীন হয়। তবুও জীবনধর্মিতা বজায় রাখতে মনের ভেতর লুকিয়ে-থাকা সৌন্দর্য-সুন্দরকে প্রকাশ করতে তারা দ্বিধা করে না। কিছু অতিরিক্ত আয় হলে তারা আগে-পিছে না ভেবে গোলাপচারা কিনে আনে। তারা জীবনের স্বরূপ বোঝে বলেই জীবনের স্বাদ পেতে অসুখবিসুখে অবসন্ন হয়েও ধারদেনার দ্বারা কর্মজীবনে ফিরতে উদ্যোগী হয়।
(৯) “সে অনেক পরের কথা। টান দিই গঞ্জিকাতে।”- কোন প্রসঙ্গে বক্তার এই উক্তি ? সে গঞ্জিকাতেই-বা টান দেয় কেন ? ২+৩=৫
উত্তর – উক্তির প্রসঙ্গ: জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতার এই উক্তিতে সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের স্বভাবজাত স্বাভাবিকতার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এই শ্রেণির মানুষ নিজেদের চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও একটি পরিশুদ্ধ মানসিকতা বজায় রাখে। ফলে পেটের ভাত না থাকলেও তারা আবেগমথিত ভাবনায় বেশ কিছু কাজ করে ফেলে। কবিতার কথকও তেমন ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে গোলাপচারা কিনে আনে। অথচ কোথায় পুঁতবে, কীভাবে পরিচর্যা হবে, তাতে আদৌ ফুল হবে কি না, সে-ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। পরক্ষণেই মনকে প্রবোধ দিয়ে সংশয়মুক্ত হতে চাওয়ার প্রসঙ্গে কথাটি বলে।
গঞ্জিকাতে টান দেওয়ার কারণ: সৌন্দর্যচেতনার ভাবনাবিলাস নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ক্ষণে ক্ষণে আসে, আবার মিলিয়েও যায়। দূরের ভাবনা দূর অস্ত, অনতিদূরের ভাবনাকেও তারা বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখতে পারে না। বরং সাময়িক উত্তেজনাকর আকর্ষণীয় ভাবনায় তারা মশগুল থাকে বেশি। আর এটাই তাদের অধিকতর পছন্দের। এর জন্য তারা নেশার আশ্রয় নেয় এবং দৈনন্দিন অপ্রাপ্তি ভুলে থাকতে সাময়িকভাবে হলেও আবেশে-বিবশতায় নিস্পৃহ ও উদাসীন থাকতে আগ্রহী হয়। আসলে গাঁজা অর্থাৎ গঞ্জিকা একটি নেশার বস্তু, যা খেলে ব্যক্তি মনে করে, তার যাবতীয় দুঃখ-শোক দূর হবে। তাই জাগতিক দুঃখ- যন্ত্রণা ভোলার অভিপ্রায়ে গঞ্জিকায় টান দেয় এইসব নীচের মহলের মানুষরা।
(১০) “আমরা তো এতেই খুশি; বলো আর অধিক কে চায়?”- ‘এতেই’ বলতে বক্তা কী বুঝিয়েছেন ? পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য লেখো। ২+৩=৫
উত্তর – ‘এতেই’ শব্দটির ইঙ্গিত: ‘এতেই’ শব্দটি একবচনাত্মক সর্বনাম হলেও ‘নুন’ কবিতায় শব্দটি বহুবচনের ইঙ্গিত দেয়। কবি নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে তাদের জীবনযাপনের ধরনগুলিকেও শব্দটির দ্বারা বুঝিয়েছেন। বিশেষ করে তাদের অল্পে খুশি থাকা, সাধারণ ভাতকাপড়ে দিন কাটানো, অসুখে ধারদেনায় জীবনযাপন, মাত্রাছাড়া বাজারের দিনে গোলাপচারা কিনে আনা এবং গঞ্জিকা সেবনের দ্বারা দুঃখ ভোলার ব্যর্থ চেষ্টার বিষয়গুলিকেই বক্তা ‘এতেই’ বহুবচনাত্মক শব্দে প্রকাশ করেছেন।
তাৎপর্য: মানুষ ঠিক কীসে সর্বাত্মক খুশি হয় তা যেমন বলতে পারে না, তেমনি সে যে আরও বেশি চায় না-এ কথাও বলতে পারে না। কিন্তু ‘নুন’ কবিতার বক্তা স্পষ্টভাবে বলেছে-সে বা তারা যে গোত্রের মানুষ সেখানে তারা কোনোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচেবর্তে থাকতে পারলেই খুশি। এর চেয়ে বেশি চাহিদা তাদের নেই। তবে হ্যাঁ, সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে গোলাপচারা কেনার সামর্থ্যটুকু তারা অর্জন করতে চায়। অকারণ দুশ্চিন্তায় তারা থাকতে চায় না। আর চায় না বলেই ঠান্ডা ভাতে নুন না পেয়ে তারা প্রতিবেশীদের সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও চিৎকার করে। বলে- ‘করি তো কার তাতে কী?’ তখন বুঝতে হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু তারা পাচ্ছে না। ফলে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে সমাজের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাদের চাহিদার কথা জানিয়ে বলে-“আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।“
(১১) ‘নুন’ কবিতার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে নিজের ভাষায় লেখো। ৫
উত্তর – ‘নুন’ কবিতার মূল বক্তব্য: জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতাটি নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনবেদ। তারা অল্পতেই খুশি থাকে। অভাবী সংসারে অসুখবিসুখ-সহ ধারদেনায় জীবন কাটায়। এসব নিয়ে তাদের দুঃখ নেই। শত অভাবের মধ্যেও তারা মনে পুষে রাখে অনাবিল সৌন্দর্যবোধ। ফলে বাজার করার সঙ্গে সঙ্গে আগাপাছতলা না ভেবে গোলাপচারা কিনে আনে। অথচ তারা জানে না, তাতে ফুল হবে কি না। আসলে এই শ্রেণির মানুষ জীবন নিয়ে ভাবিত নয়। তারা কেবল আপাত ও তাৎক্ষণিক আবশ্যিক প্রয়োজন টুকুই বোঝে। তাই উপার্জনহীন দিনে দুপুররাতে ঘরে ফিরে ঠান্ডা ভাতে নুন না পেয়ে তারা অতিশয় বিরক্ত হয়। মাথায় রাগ চড়ে যায়। গঞ্জিকায় টান দিয়ে তারা স্বাভাবিক বোধবুদ্ধর বাইরে থাকে। এমতাবস্থায় গাঁজার নেশায় স্থানকালপাত্র অগ্রাহ্য করে বাপব্যাটায় স্বার্থান্ধ দু-ভাইয়ের মতো ঝগড়ায় মত্ত হয়। প্রতিবেশীরা তাদের ধর্তব্যের মধ্যে থাকে না। বেপরোয়াভাবে ঘোষণা করে- “করি তো কার তাতে কী?”
পাঠ্য ‘নুন’ কবিতায় কবি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যে দীর্ণ নিম্নবিত্ত মানুষের ছোটো ছোটো সুখ, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন। আর সেখানে তাদের একটাই প্রত্যাশা- “আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।”
(১২) “আমাদের দিনে চলে যায় সাধারণ ভাতকাপড়ে।”- ‘সাধারণ ভাতকাপড়’ বলতে কী বোঝায় ? কথাটির মাধ্যমে সমাজে টিকে থাকার প্রবল বৈষম্যের দিকটি ফুটিয়ে তোলো। ২+৩=৫
উত্তর – ‘সাধারণ ভাতকাপড়ের’ পরিচয়: ‘সাধারণ ভাতকাপড়’ কথাটির সাধারণ অর্থ কোনোমতে খেয়ে-পরে জীবনে বেঁচে থাকা। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই এভাবেই বাঁচে, বলা যায় টিকে থাকে। এমনতর জীবনযাপনে প্রতিমুহূর্তে স্বপ্ন-সাধ-বিলাসভাবনা অবদমিত থাকে। সাধের সঙ্গে সাধ্যের আকাশ-: পাতাল ফারাক থাকায় সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ এভাবেই জীবনে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়। আধুনিক সভ্যতার নাগপাশে সমাজের বৈশিষ্ট্য-বিভেদের কারণে নিম্নবিত্ত মানুষের এই দৈনন্দিন টিকে থাকার সংগ্রামে একমুঠো খেয়ে, কোনোমতে লজ্জা বাঁচিয়ে প্রাণে বেঁচে থাকার বিষয়কেই কবি জয় গোস্বামীর ‘নুন’ কবিতায় ‘সাধারণ ভাতকাপড়’ বোঝানো হয়েছে।
সমাজের বৈষম্যের দিক: আধুনিক শিল্পোন্নত ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট। আজ শাসনব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে যে, একশ্রেণির মানুষ বিলাসব্যসন-ঐশ্বর্যে বিত্তবান হয়ে উঠছে, অন্যদিকে অন্যশ্রেণির মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছে। অথচ দরিদ্রের কঠোর পরিশ্রমেই ধনিক শ্রেণির বিত্তের পাহাড় গড়ে ওঠে। তাদের অতুল বৈভবের নীচে শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম আহার্য পর্যন্ত চাপা থাকে। ফলে পরিশ্রমী দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষগুলি বেঁচে থাকার সামান্যতম আহারসামগ্রী জোগাড় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা ক্ষুধায় কাতর হয়ে শীর্ণ দেহে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় দিনপাত করে। একদিকে উচ্চবিত্তের জৌলুস-ঐশ্বর্যের মহাসমারোহ, অন্যদিকে ঠান্ডাভাতে নুন না-পাওয়ার ক্ষোভে অকারণ চিৎকার-করা নিম্নবিত্তের ‘সাধারণ ভাতকাপড়ে’ দিন চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কবি তাই সমাজের প্রবল বৈষম্যের দিকটিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
(১৩) “বাপব্যাটা দু-ভাই মিলে সারাপাড়া মাথায় করি”- ‘বাপব্যাটা’ দু-ভাই হয়ে ওঠে কীভাবে ? ‘সারাপাড়া মাথায়’ করা ব্যাপারটি বুঝিয়ে দাও। ২+৩=৫
উত্তর – পরিস্থিতি সাপেক্ষে: সাধারণ বা আভিধানিক দিক দিয়ে ‘বাপব্যাটা’র দু-ভাই হয়ে ওঠা অসম্ভব। কিন্তু আমরা বিষয়টিকে আচরণগত দিক দিয়ে ভাবলে বুঝতে পারি তারা জন্মগতভাবে আলাদা অবস্থানে থাকলেও সমধর্মী সহোদরের মতো হতে পারে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী পরিবারে পিতা-পুত্রের মধ্যে সম্ভ্রমাত্মক স্বভাব-দূরত্ব সাধারণত থাকে না। বিশেষ করে তারা যদি নেশায় আসক্ত হয়। বাবা-ছেলের পারস্পরিক সম্ভ্রমহীন কথাবার্তা ও শালীনতাহীন আচরণের মাধ্যমে তারা দু-ভাইয়ের মতো আচরণধর্মী হয়ে তাৎপর্যে বাপব্যাটা দু-ভাই হয়ে উঠতে পারে।
সারাপাড়া মাথায় কীভাবে: ‘নুন’ কবিতার অতি তাৎপর্যমণ্ডিত এই পঙক্তিটি বিশিষ্ট অর্থে প্রযুক্ত। পাড়া মাথায় করা আসলে পাড়ার প্রতিবেশীদের অতিষ্ট করে তোলা। তাদের চরম বিরক্তির কারণ হওয়া। একদিকে ‘বাপব্যাটা দু-ভাই’ অন্যদিকে পাড়া মাথায় করা ব্যাপারটি হল আচরণ সাপেক্ষ। অশান্তির দরুন বাপব্যাটা তুমুল কলহে লিপ্ত হয় গভীর রাতে। এইসময় প্রতিবেশীরা হয়তো গভীর নিদ্রায় মগ্ন। পরম শান্তিতে রাত কাটবে ভেবে ঘুমোচ্ছেন। অথচ আচমকা বাপব্যাটা সবকিছু উপেক্ষা করে সেই মুহূর্তে স্থানকালপাত্র অগ্রাহ্য করে ঝগড়ায় উন্মত্তের মতো দানবীয় আচরণ করছে। তাদের সার্বিক অসুবিধা, অশান্তি ও বিরক্তির কারণ হচ্ছে। সেইমতো তাদের সম্পর্কে চরম অনীহা দেখিয়ে বলছে-‘করি তো কার তাতে কী?’ আসলে ‘বাপব্যাটার’ এই ব্যবহারে প্রতিবেশীদের যে সর্বাঙ্গীণ বিরক্তিকর অবস্থা কবি তাকেই ‘সারাপাড়া মাথায়’ করা বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আরও পড়ুন –
লালন শাহ ফকিরের গান প্রশ্ন উত্তর
ভাব সম্মিলন কবিতার প্রশ্ন উত্তর
তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্প প্রশ্ন উত্তর
YouTube – Samim Sir